নবীন প্রেমের উদয়! দ্বিতীয় খণ্ড,
নাঈম হোসেন
পর্ব: এগারো [ হুবহু জেমির বর্ণনা; ]
👩জেমি: পরিরাজ গায়রে হেরার পুরো এরিয়া ঘুরে জাবালে নুরের যেখানে নবী মোহাম্মদ (সঃ) ধ্যানমগ্ন থাকতেন সেখানে বসে কচি শিশুর মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠল ;
💂পরিরাজ: চোখের পানি মুছতে মুছতে, এখানে বসে অনেক কথা অনেক স্মৃতি মনে পড়ে গেল তাই!
👩জেমি: কী এমন কথা স্মরণ করে তুমি এভাবে কাঁদলে?
💂পরিরাজ: আমার নবী কত কষ্ট করে পাহাড় বেয়ে বেয়ে এখানে এসেছেন, তারপর আল্লাহর স্মরণে নিজেকে বিকিয়ে দিয়েছেন ; তারপর হঠাৎ করে একদিন আল্লাহ নবী (সাঃ) এর উপর ওহী পাঠালেন, তারপর ওহী নিয়ে তিনি মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে সেই ওহীর বার্তা প্রচার করলেন, দ্বীনের দাওয়াত দিতে গিয়ে কত বাঁধা, কত অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করলেন ; ওহুদের ময়দানে নিজের দাঁত শহীদ করলেন, তায়েফে মার খেলেন, অবশেষে ইসলামের চির বিজয় হলো। নবী (সাঃ) -এর কষ্টের সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ হতেই আমার আঁখি অশ্রুতে ভিজে যায়, নবীর প্রেমে আমার মন উদাস হয়ে উঠে। আহা কতো বেদনার এই ইসলাম! আহা কতো শান্তির এই ইসলাম!
মনে পড়ে কত কথা কত স্মৃতি!
কত পথ পাড়ি দিয়ে,
কত নদী সাঁতরিয়ে,
কত বেদনায় পেয়েছি এই ইসলাম নীতি!
কোরআনের বাণী প্রচারে গিয়ে,
কতো সাহাবা গেল শহীদ হয়ে।
তবু করলনা ভয় গেলনা পিছিয়ে,
নবীর প্রেমে জান ও মাল সব গেল বিকিয়ে।
কী বিস্ময় শান্তির বার্তা আল কোরআন!
ধন্য ওরা,গর্বিত ওরা, ওরা মুসলমান!
ওরা জীবন গঠন করে কোরআনের মতে,
ওদের গন্তব্য সুদূর জান্নাতের পথে।
👩জেমি: এই তুমি চোখের জল মুছো, কারণ কারো কান্না দেখলে আমারও খুব কান্না আসে।
পরিরাজ: খিলখিল এক চিমটি হেসে, তাই নাকি? তাহলে তো তুমি খুব মায়াবী, যাকে বলে মহামায়া!
জেমি: সত্যি আমার খুব মায়া, প্রতিটি প্রাণির জন্যই আমার খুব মমতা হয়। কোথাও কাউকে কষ্টে দেখলে আমারও খুব কষ্ট হয় ; কাউকে কাঁদতে দেখলে আমারও খুব কান্না পায়, কাউকে অভুক্ত দেখলে তাকে কিছু না দিতে পারলে সেদিন আর আমার পেটে কোন খাবার যায়না।
💂পরিরাজ: পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ যদি তোমার মতো হতো তাহলে পৃথিবীটা স্বর্গরাজ্য হয়ে যেতো।
জেমি: হয়েছে আর প্রশংসা করতে হবেনা, তুমি একটু বেশী বলে ফেলেছো;
জেমি: আচ্ছা আমি একটা বিষয় জানতে কৌতূহলী, তোমাকে প্রশ্ন করতে পারি কী?
পরিরাজ: অফকোর্স।
জেমি: তুমি যে ওহীর কথা বলছো, সে ওহী কী? ওহী সম্পর্কে আমাকে একটু বুঝিয়ে বল;
💂পরিরাজ: ওকে, বলছি;
💂পরিরাজ: ভ্রু কুচকিয়ে, একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে, ওহী শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, এমন সূক্ষ্ম ও গোপন ইশারা, যা ইশারাকারী ও ইশারা গ্রহণকারী ছাড়া তৃতীয় কেউ টের পায় না। এ সম্পর্কের ভিত্তিতে এ শব্দটি ইলকা বা মনের মধ্যে কোনো কথা নিক্ষেপ করা ও ইলহাম বা গোপনে শিক্ষা ও উপদেশ দান করার অর্থে ব্যবহৃত হয়।
💂পরিরাজ: ওহি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, [২৪] "আর দেখো তোমার রব মৌমাছিদেরকে একথা অহীর মাধ্যমে বলে দিয়েছেনঃ তোমরা পাহাড়-পর্বত, গাছপালা ও মাচার ওপর ছড়ানো লতাগুল্মে নিজেদের চাক নির্মাণ করো।"
💂পরিরাজ: এখানেও অহীর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, এমন সূক্ষ্ম ও গোপন ইশারা, যা ইশারাকারী ও ইশারা গ্রহণকারী ছাড়া তৃতীয় কেউ টের পায় না। এ সম্পর্কের ভিত্তিতে এ শব্দটি ‘ইলকা’ (মনের মধ্যে কোন কথা নিক্ষেপ করা) ও ইলহাম (গোপন শিক্ষা ও উপদেশ দান করা) অর্থে ব্যবহৃত হয়। মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিকে যে শিক্ষা দান করেন তা যেহেতু কোন মকতব, স্কুল বা শিক্ষায়তনে দেয়া হয় না বরং এমন সূক্ষ্ম পদ্ধতিতে দেয়া হয় যে, বাহ্যত কাউকে শিক্ষা দিতে এবং কাউকে শিক্ষা নিতে দেখা যায় না, তাই একে কুরআনে অহী, ইলকা ও ইলহাম শব্দের মাধ্যমে ব্যক্ত করা হয়েছে। এখন এ তিনটি শব্দ আলাদা আলাদা পরিভাষায় পরিণত হয়েছে। অহী শব্দটি নবীদের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে গেছে। ইলহামকে আউলিয়া ও বিশেষ বান্দাদের জন্য নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। আর ইলকা শব্দটি অপেক্ষাকৃত ব্যাপক অর্থবোধক এবং সকলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
কিন্তু কুরআনে পারিভাষিক অর্থের পার্থক্যটা পাওয়া যায় না। এখানে আকাশের ওপরও অহী নাযিল হয় এবং সেই অনুযায়ী তার সব ব্যবস্থা পরিচালিত হয়, পৃথিবীর ওপরও অহী নাযিল হয় এবং এর ইঙ্গিত পাওয়ার সাথে সাথেই সে নিজের কাহিনী শুনাতে থাকে ; ফেরেশতাদের ওপরও অহী নাযিল হয় এবং সেই মোতাবেক তারা কাজ করে, মৌমাছিদেরকে তাদের সমস্ত কাজ অহীর (প্রকৃতিগত শিক্ষা) মাধ্যমে শেখানো হয়। আলোচ্য আয়াতে এ বিষয়টিই দেখা যাচ্ছে। আর এই অহী কেবলমাত্র মৌমাছি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নেই বরং মাছের সাঁতার কাটা, পাখির উড়ে চলা, নবজাত শিশুর দুধ পান করার বিষয়টাও আল্লাহর অহীই শিক্ষা দান করে। তাছাড়া চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা অনুসদ্ধান ছাড়াই একজন মানুষকে যে অব্যর্থ কৌশল বা নির্ভুল মত অথবা চিন্তা ও কর্মের সঠিক পথ বুঝানো হয় তাও অহী।
এ অহী থেকে কোন একজন মানুষও বঞ্চিত নয়। দুনিয়ায় যত নতুন নতুন উদ্ভাবন ও কল্যাণকর আবিষ্কার হয়েছে যত বড় বড় শাসক, বিজেতা, চিন্তানায়ক ও লেখক যুগান্তকারী ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী কর্ম সম্পাদন করেছেন তার সবের পেছনেই এ অহীর কার্যকারিতা দেখা যায়। বরং সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত যে অভিজ্ঞতার সুম্মুখীন হয় তা হচ্ছে এই যে, কখনো বসে বসে একটি কথা মনে হলো অথবা কোন কৌশল মাথায় এলো কিংবা স্বপ্নে কিছু দেখা দিলো এবং পরবর্তী সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে জানা গেলো যে, অদৃশ্য থেকে পাওয়া সেটি তার জন্য একটি সঠিক পথনির্দেশনা ছিল।
💂পরিরাজ: এ বিভিন্ন ধরনের অহীর মধ্যে নবীদেরকে যে অহী করা হতো সেটি ছিল একটি বিশেষ ধরনের অহী। এ অহীটির বৈশিষ্ট্য অন্যান্য অহী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এতে যাকে অহী করা হয় সে এ অহী আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন ও নিশ্চিত থাকে। এ অহী হয় আকীদা-বিশ্বাস, বিধি-বিধান, আইন-কানুন ও নির্দেশাবলী সংক্রান্ত। আর নবী এ অহীর মাধ্যমে মানব সম্প্রদায়কে পথনির্দেশ দেবেন এটিই হয় এর নাযিল করার উদ্দেশ্য।
💂পরিরাজ: ব্যবহারিক ভাবে ওহী দ্বারা ইসলামে আল্লাহ কর্তৃক নবি-রাসূলদের প্রতি প্রেরিত বার্তা বোঝানো হয়। কুরআন মাজিদে বলা হয়েছে,[২৫] "নিশ্চয় আমি তোমার নিকট ওহী পাঠিয়েছি, যেমন ওহী পাঠিয়েছি নুহ ও তার পরবর্তী নবীগণের নিকট এবং আমি ওহী পাঠিয়েছি ইবরাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব, তার বংশধরগণ, ঈসা, আইয়ুব, ইউনুস, হারুন ও সুলায়মান এর নিকট এবং দাউদকে প্রদান করেছি যাবুর।"
💂পরিরাজ: পবিত্র কুরআনের অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, [২৬] "কোনো মানুষের এ মর্যাদা নেই যে, আল্লাহ তার সাথে সরাসরি কথা বলবেন, ওহীর মাধ্যম, পর্দার আড়াল অথবা কোনো দূত পাঠানো ছাড়া। তারপর আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে তিনি যা চান তাই ওহী প্রেরণ করেন। তিনি তো মহীয়ান, প্রজ্ঞাময়।"
💂পরিরাজ: কুরআন কারীম মানব জাতির কাছে প্রেরিত মহান আল্লাহর সর্বশেষ বাণী। এর প্রতিটি অক্ষর, শব্দ ও বাক্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত। মহানবী মুহাম্মদ (সাঃ)-এর বযস যখন ৪০ বৎসর তখন থেকে আল্লাহ তাঁর কাছে ওহীর মাধ্যমে কুরআন প্রেরণ করতে শুরু করেন। পরবর্তী ২৩ বৎসর যাবৎ বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজন মত কুরআনের বিভিন্ন সুরা ও আয়াত অবতীর্ণ করা হয়। ২৩ বৎসরে তা পরিপূর্ণরূপে অবতারিত হয়। আল্লাহর নিকট থেকে প্রধান ফিরিশতা জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ)- এর কাছে ওহী নিয়ে আসতেন।
💂পরিরাজ: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তা পরিপূর্ণভাবে মুখস্থ করে নিতেন। এরপর তিনি তার সাহাবীদেরকে নির্দেশ দিতেন তা মুখস্থ করার জন্য এবং লিখে রাখার জন্য। এভাবে পরিপূর্ণ কুরআন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) -এর জীবদ্দশায় পৃথক পৃথক কাগজ, চামড়া, হাড় ইত্যাদিতে লিপিবদ্ধ করা হয় এবং অসংখ্য সাহাবী তা মুখস্থ করে নেন।
তাঁর সময় থেকেই তিনি ও সাহাবীগণ সাধারণ সালাতে এবং বিশেষত রাত্রিতে তাহাজ্জুদের সালাতে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত ও খতম করতেন, অর্থাৎ পরিপূর্ণ কুরআন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মুখস্থ পাঠ করতেন।
💂পরিরাজ: অনেক সাহাবীই ৩ থেকে ৭ রাত্রিতে তাহাজ্জুদের সালাতে কুরআন খতম করতেন। কেউ কেউ একটু বেশি সময় ধরে কমবেশি এক মাসের মধ্যে তাহাজ্জুদ সালাতে কুরআন খতম করতেন। এছাড়া নিজের কাছে সংরক্ষিত লিখিত পাণ্ডুলিপি থেকে দেখে দেখে দিবসে ও রাত্রিতে তা পাঠ করা ছিল সাহাবীগণের প্রিয়তম ইবাদত ও হৃদয়ের সবচেয়ে বড় তৃপ্তি ও আনন্দের কর্ম।
💂পরিরাজ: এভাবে মূলত মুমিনদের হৃদয়ে মুখস্থ রেখে ও নিয়মিত রাতের সালাতে (তাহাজ্জুদে) খতমের মাধ্যমেই কুরআনকে অবিকল আক্ষরিকভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন আল্লাহ। এছাড়া রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর ওফাতের পরের বৎসর খলীফা আবূ বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সময়ে লিখিত পৃথক কাগজ, চামড়া, হাড় ইত্যাদি থেকে একত্রিত করে পুস্তকাকারে সংকলন করান।
💂পরিরাজ: পরবর্তীকালে খলীফা উসমান (রাঃ) তাঁর শাসনামলে নতুন মুসলিম প্রজন্মের মানুষদের বিশুদ্ধ কুরআন শিক্ষা ও মুখস্থ করণের সুবিধার্থে আবূ বাকর (রাঃ) কর্তৃক পুস্তকাকারে সংকলিত কুরআনটির বিভিন্ন অনুলিপি তৈরি করে বিভিন্ন এলাকায় প্রেরণ করেন।
💂পরিরাজ: এভাবে সকল মুসলিমের প্রাত্যহিক পাঠের প্রিয়তম ধর্মগ্রন্থ হিসেবে কুরআন কারীম পরিপূর্ণ ও অবিকৃতভাবে অগণিত মানুষের হৃদয়পটে এবং পুস্তকাকারে সংরক্ষিত হয়। যেভাবে তা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)এর উপর অবতারিত হয়েছে আজ পর্যন্ত ঠিক তেমনিভাবে অবিকৃত ও অপরিবর্তিতভাবে সংরক্ষিত রয়েছে এবং সকল যুগেই লক্ষ লক্ষ মুসলিম তা পরিপূর্ণ মুখস্থ করে রেখেছেন।
💂পরিরাজ: এ কুরআনই মানব জাতির পথের দিশারী এবং সকল কল্যাণের উৎস। এতে রয়েছে সকল উপদেশ, শিক্ষা ও সকল আত্মিক ও মানসিক অসুস্থতার মহৌষধ।
💂পরিরাজ: মানবজাতিকে কালো জীবন থেকে হেদায়েতের পথে আনার জন্য পুরো তিরিশ পারা কোরআন শরীফ বিবিধ সময়, বিভিন্ন কারণে যখন ঠিক যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই বিভিন্নভাবে নবী (সাঃ) এর উপরে অবতীর্ণ হয়েছে।
💂পরিরাজ: কুরআনই প্রত্যেক মুমিনের বিশ্বাস, ঈমান বা আকীদার মূল ভিত্তি। কুরআন কারীমে যা কিছু বলা হয়েছে তা আক্ষরিকভাবে ও সরলভাবে বিশ্বাস করাই ইসলামী আকীদার মূল ভিত্তি।
💂পরিরাজ: কোন বিষয়ে বিশ্বাস করতে হবে, কিভাবে বিশ্বাস করতে হবে, কিসে বিশ্বাস নষ্ট হবে, কিসে কুফরী হবে, কিসে শিরক হবে, কিভাবে ও কি কারণে পূর্ববর্তী উম্মাতগণ ঈমান লাভ করার পরেও বিভ্রান্ত হয়েছিল, কিভাবে বিভ্রান্তি থেকে আত্মরক্ষা করা যায়, কিভাবে ঈমানদার ব্যক্তি জীবনযাপন করবেন, ইত্যাদি বিষয়ই হলো, কুরআন কারীমের মূল শিক্ষা। এককথায় বলতে গেলে আল-কুরআনই ইসলামী আকীদার প্রধান ও মূল উৎস।
💂পরিরাজ: এখানে কুরআনের আয়াত থেকে আক্ষরিক, সরল ও স্বাভাবিক যে অর্থ বুঝা যায় তাই আকীদার মূল উৎস, কুরআনের তাফসীর বা ব্যাখ্যা নামে পরিচিতি পরবর্তী যুগগুলির আলিমগণের মতামত আকীদার উৎস নয়।
💂পরিরাজ: মহান আল্লাহ কুরআন কারীমকে সহজ ও অত্যন্ত সুস্পষ্ট আরবী ভাষায় নাযিল করেছেন এবং তা বুঝা সহজ করেছেন বলে কুরআন কারীমে বারংবার উল্লেখ করেছেন। সাধারণভাবে কুরআন কারীম নিজেই নিজের ব্যাখ্যা করে। এছাড়া কুরআনের ব্যাখ্যার বিষয়ে কোনো সহীহ হাদীস বর্ণিত হলে তাও ওহীর ব্যাখ্যা বলে গণ্য। এছাড়া কুরআন ও হাদীসের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সাহাবী-তাবিয়ীগণের ব্যাখ্যাকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদাণ করা হয়।
💂পরিরাজ: পরবর্তী যুগের আলিমগণ তাফসীরের ক্ষেত্রে যা কিছু বলেছেন তা আলিমগণের ব্যক্তিগত ইজতিহাদ, রায় বা মতামত হিসেবে পর্যালোচনার গুরুত্ব লাভ করে, কিন্তু কখনোই তা ওহীর সমতুল্য বা সম্পূরক নয় এবং তা আকীদার ভিত্তি নয়।
👩জেমি: ওহী কীভাবে নাযিল হতো?
পরিরাজ: বলছি; ফের একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে, আল্লাহ তাআলা যে ওহি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট অবতীর্ণ করেছেন সেগুলো ২টি শাখায় বিভক্ত। ওহিয়ে মাতলু এবং ওহিয়ে গাইরে মাতলু।
👩জেমি: ওহীর প্রকার দুটি কী কী ?
💂পরিরাজ: ওহিয়ে মাতলু : এমন ওহি যার শব্দ, বাক্য অর্থ, মর্ম সবকিছুই আল্লাহর তরফ থেকে আগত। পরিভাষায় এটি আল-কুরআনুল কারিম নামে পরিচিত।
💂পরিরাজ: আর ওহিয়ে গাইরে মাতলু : এমন ওহি যার অর্থ ও মর্ম আল্লাহ প্রেরিত কিন্তু শব্দ ও বাক্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের। ইসলামের পরিভাষায় যা ওহিয়ে হাদিস ও সুন্নাহ নামে পরিচিত।
💂পরিরাজ: এবার তোমাকে বলছি, ওহি নাযিলের পদ্ধতি ; [ এক] অন্তরে কোন কথা প্রক্ষিপ্ত করা ( ঢুকিয়ে দেওয়া ) অথবা স্বপ্নে বলে দেওয়া, এই প্রত্যায়ের সাথে যে, তা আল্লাহরই পক্ষ হতে স্বপ্নের মাধ্যমে নাবী কারীম (সাঃ)-এর উপর ওহী অবতীর্ণ হয়।
আল্লাহ বলেন, [২৭] কোন মানুষই এ মর্যাদার অধিকারী নয় যে, আল্লাহ তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলবেন, তিনি কথা বলবেন হয় অহীর মাধ্যম,
💂পরিরাজ: এখানে অহী অর্থ ইলকা, ইলহাম, মনের মধ্যে কোন কথা সৃষ্টি করে দেওয়া কিংবা স্বপ্নে কিছু দেখিয়ে দেওয়া, যেমনটি হযরত ইব্রাহিম ও ইউসুফ নবীকে দেখানো হয়েছিল ;
👩জেমি: তাদেরকে স্বপ্নে কী দেখানো হয়েছিল?
পরিরাজ: বলছি, [২৮] এটা সেই সময়ের কথা, যখন ইউসুফ তাঁর বাপকে বললোঃ “আব্বাজান! আমি স্বপ্ন দেখেছি, এগারটি তারকা এবং সূর্য ও চাঁদ আমাকে সিজদা করছে।”
💂পরিরাজ: [২৯] শহরে প্রবেশ করার পর) সে নিজের বাপ-মাকে উঠিয়ে নিজের পাশে সিংহাসনে বসালো এবং সবাই তার সামনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সিজদায় ঝুঁকে পড়লো। ইউসুফ বললো, “আব্বাজান! আমি ইতিপূর্বে যে স্বপ্ন দেখেছিলাম এ হচ্ছে তার তা’বীর। আমার রব তাকে সত্য পরিণত করেছেন।
আমার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ হিসেবে তিনি আমাকে কারাগার থেকে বের করেছেন এবং আপনাদেরকে মরু অঞ্চল থেকে এনে আমার সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন। আসলে আমার রব অননুভূত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তাঁর ইচ্ছা পূর্ণ করেন। নিঃসন্দেহে তিনি সবকিছু জানেন ও সুগভীর প্রজ্ঞার অধিকারী।
💂পরিরাজ: অপরদিকে হযরত ইব্রাহিম নবীর স্বপ্ন ছিল যে, [৩০] সে পুত্র যখন তার সাথে কাজকর্ম করার বয়সে পৌঁছলো তখন (একদিন ইবরাহীম তাকে বললো, “ হে পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখি তোমাকে আমি যাবেহ করছি, এখন তুমি বল তুমি কি মনে কর?” সে বললো, “ হে আব্বাজান! আপনাকে যা হুকুম দেয়া হচ্ছে তা করে ফেলুন, আপনি আমাকে ইনশাআল্লাহ সবরকারীই পাবেন৷”
💂পরিরাজ: একথা মনে রাখতে হবে , হযরত ইবরাহীম (আঃ ) স্বপ্ন দেখেননি যে , তিনি পুত্রকে যবেহ করে ফেলেছেন৷ বরং তিনি দেখেছিলেন , তিনি তাকে যবেহ করছেন৷
💂পরিরাজ: যদিও তিনি তখন স্বপ্নের এ অর্থই নিয়েছিলেন যে , তিনি পুত্রকে যবেহ করবেন৷
এ কারণে তিনি ঠাণ্ডা মাথায় পুত্রকে কুরবানী করে দেবার জন্য একেবারেই তৈরি হয়ে গিয়েছিলেন৷ কিন্তু স্বপ্ন দেখাবার মধ্যে মহান আল্লাহ যে সূক্ষ্ম বিষয় সামনে রেখেছিলেন তা সূরা সফফাতের ১০৫ আয়াতে তিনি নিজেই সুম্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, সেখানে বলা হয়েছে, " তুমি স্বপ্নকে সত্য করে দেখিয়ে দিয়েছো৷ আমি সৎকর্মকারীদেরকে এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি৷"
💂পরিরাজ: পুত্রকে একথা জিজ্ঞেস করার এ অর্থ ছিল না যে, তুমি রাজি হয়ে গেলে আল্লাহর হুকুম তামিল করবো অন্যথায় করবো না৷ বরং হযরত ইবরাহীম আসলে দেখতে চাচ্ছিলেন , তিনি যে সৎ সন্তানের জন্য দোয়া করেছিলেন সে যথার্থই কতটুকু সৎ ৷ যদি সে নিজে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষে প্রাণ উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকে , তাহলে এর অর্থ হয় দোয়া পুরোপুরি কবুল হয়েছে এবং পুত্র নিছক শারীরিক দিক দিয়েই তাঁর সন্তান নয় বরং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক দিয়েও তাঁর সুসন্তান৷
💂পরিরাজ: এ শব্দগুলো পরিস্কার জানিয়ে দিচ্ছে , নবী - পিতার স্বপ্নকে পুত্র নিছক স্বপ্ন নয় বরং আল্লাহর হুকুম মনে করেছিলেন ৷ এখন যদি যথাযর্থই এটি আল্লাহর হুকুম না হতো তাহলে অবশ্যই আল্লাহ পরিস্কারভাবে বা ইংগিতের মাধ্যমে বলে দিতেন যে , ইবরাহীম পুত্র ভুলে একে হুকুম মনে করে নিয়েছে, কিন্তু পূর্বাপর আলোচনায় এর কোন ইংগিত নেই৷ এ কারণে নবীদের স্বপ্ন নিছক স্বপ্ন নয় বরং তাও হয় এক ধরনের অহী , মুসলমানরা এ বিশ্বাস পোষণ করে৷
💂পরিরাজ: পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে যে , [৩১] তুমি স্বপ্নকে সত্য করে দেখিয়ে দিয়েছো৷ আমি সৎকর্মকারীদেরকে এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি৷
💂পরিরাজ: অর্থাৎ তুমি পুত্রকে যবেহ করে দিয়েছো এবং তার প্রাণবায়ু বের হয়ে গেছে , এটা তো আমি তোমাকে দেখাইনি৷ বরং আমি দেখিয়েছিলাম , তুমি যবেহ করছো৷ তুমি সে স্বপ্নকে সত্য করে দেখিয়ে দিলে৷ কাজেই এখন তোমার সন্তানের প্রাণবায়ূ বের করে নেয়া আমার লক্ষ নয়৷ আসল উদ্দেশ্য যা কিছু তা তোমার সংকল্প , উদ্যোগ ও প্রস্তুতিতেই সফল হয়ে গেছে৷
💂পরিরাজ: অর্থাৎ যারা সংকর্মের পথ অবলম্বন করে তাদেরকে আমি খামখা কষ্টের মধ্যে ফেলে দেবার এবং দুঃখ ও ক্লেশের মুখোমুখি করার জন্য পরীক্ষার সম্মুখীন করি না৷ বরং তাদের উন্নত গুণাবলী বিকশিত করার এবং তাদেরক উচ্চ মর্যাদা দান করার জন্যই তাদেরকে পরীক্ষার মুখোমুখি করি৷
তারপর পরীক্ষার খাতিরে তাদেরকে যে সংকট সাগরে নিক্ষেপ করি তা থেকে নিরাপদে উদ্ধারও করি৷ তাই দেখো , পুত্রের কুরবানীর জন্য তোমার উদ্যোগ প্রবণতা ও প্রস্তুতিই এমন মর্যাদা দানের জন্য যথেষ্ট হয়ে গেছে , যা আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য যথার্থই পুত্র উৎসর্গকারী লাভ করতে পারতো৷ এভাবে আমি তোমার পুত্রের প্রাণ ও রক্ষা করলাম এবং তোমাকে এ উচ্চ মর্যাদাও দান করলাম৷
💂পরিরাজ: ওহী নাযিলের আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে, পর্দার আড়াল থেকে সরাসরি কথা বলা, যেমন ফিরিশতা দেখা না দিয়ে অর্থাৎ অদৃশ্য অবস্থান থেকেই রাসূল (সাঃ)-এর অন্তরে ওহী প্রবেশ করিয়ে দেন।
💂পরিরাজ: এ প্রসঙ্গে নাবী কারীম (সাঃ) যেমনটি ইরশাদ করেছেন, ‘জিবরাঈল (আঃ) ফিরিশতা আমার অন্তরে এ কথা নিক্ষেপ করলেন যে, কোন আত্মা সে পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না যে পর্যন্ত তার ভাগ্যে যতটুকু খাদ্যের বরাদ্দ রয়েছে পুরোপুরিভাবে তা পেয়ে না যাবে। অতএব, তোমরা আল্লাহকে সমীহ কর এবং রুজি অন্বেষণের জন্য ভাল পথ অবলম্বন কর। রুজি প্রাপ্তিতে বিলম্ব হওয়ায় তোমরা আল্লাহর অসন্তোষের পথ অন্বেষণে যেন উদ্বুদ্ধ না হও। কারণ আল্লাহর নিকট যা কিছু রয়েছে তা তাঁর আনুগত্য ছাড়া পাওয়া দুস্কর।
💂পরিরাজ: পর্দার আড়াল থেকে এর সারমর্ম হচ্ছে, বান্দা শব্দ শুনতে পায় কিন্তু শব্দদাতাকে দেখতে পায়না, যেমনটি তূর পাহাড়ে হযরত মূসা নবীর বেলায় ঘটেছিল।
👩জেমি:তূর পাহাড় কোথায়? তুমি আমাকে সেখানে নিয়ে যেতে পারবে? আমি দেখতে চাই পাহাড়টি কেমন এবং আমাি শুনতে চাই সেই কাহিনী যা মূসা নবীর বেলায় ঘটেছিল!
💂পরিরাজ: তাহলে চোখ বন্ধ করে আমার হাতের উপর দাঁড়াও ; আমি তোমাকে সেখানে নিয়ে যাচ্ছি....!
নবীন প্রেমের উদয়! দ্বিতীয় খণ্ড, পর্ব: এগারো,
সমাপ্ত।।
👉রচনাকাল: ৩০ অক্টোবর ২০২২।
👉বিশেষ দ্রষ্টব্য : কপিরাইট সংরক্ষিত ৷
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন