নবীন প্রেমের উদয় , দ্বিতীয় খণ্ড ,
লেখক : নাঈম হোসেন
পর্ব: দশ [ হুবহু জেমির বর্ণনা ];
👩জেমি: কিছুক্ষণ পর পরিরাজ বলল, চোখ খোল;
জেমি: আমি চোখ খুলে বিস্মিত হলাম! এত সুন্দর দর্শনীয় স্থান আর কখনও দেখিনি!
জেমি: আমি অতি উৎসাহী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম এই স্থানের নাম কী?
💂পরিরাজ: গায়রে হেরা বা হেরা পর্বতের গুহা।
জেমি: ওয়াও!
জেমি: জায়গাটাও যেমন সুন্দর নামটা তার থেকেও বেশি সুন্দর!
জেমি: সত্যিই অত্যন্ত মনমোহিনী এই স্থান । এরকম মনকাড়া স্থান আর কভু দেখিনি!
জেমি: এমন একটা সুন্দর জায়গা দেখানোর জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
👩জেমি: আচ্ছা আমি আপনাকে কী নামে ডাকব?
পরিরাজ: কেন, বন্ধু বলে ডাকবে।
পরিরাজ: এখন থেকে তুমি আমাকে আপনি নয় বরং তুমি বলে সম্বোধন করবে।
পরিরাজ: দেখছো না আমি তোমাকে তুমি বলে ডাকছি;
জেমি: ইশ আমার শরম করছে।
💂পরিরাজ: এখানে লজ্জার কী আছে? বন্ধুকে তুমি বলে ডাকলে ভালোবাসা আরও গভীর হয়।
জেমি: ঠিক আছে চেষ্টা করব;
পরিরাজ: ধন্যবাদ!
জেমি: আপনাকেও, সরি! তোমাকেও ধন্যবাদ।
পরিরাজ: তুমি বলে ডাকার জন্য আবারও তোমাকে ধন্যবাদ।
জেমি : তোমাকেও।
জেমি: তুমি আমাকে এখানে কেন নিয়ে আসলে? আর এ জায়গার রহস্য কী?
পরিরাজ: বলছি,
পরিরাজ: সৌদি আরবের মক্কা শরিফ থেকে ছয় কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত এই পাহাড়ের নাম জাবালে নূর। এই পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত গুহাকে বলা হয় ‘গারে হেরা’ বা ‘হেরা গুহা’ । Jabal an-Nūr, lit. 'Mountain of the Light' or 'Hill of the Illumination'
পরিরাজ: কিছুক্ষণ চুপচাপ তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে, হেরা গুহা'), যা সারা বিশ্বের মুসলমানদের জন্য অসাধারণ তাৎপর্য রাখে, যেমনটি বলা হয় ইসলামিক নবী মুহাম্মদ এই গুহায় ধ্যান করার সময় কাটিয়েছেন, এবং এখানেই তিনি তাঁর প্রথম ওহী পেয়েছিলেন, যা জিবরাইল ফেরেশতা থেকে সূরা আল-আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত পেয়েছিলেন। পর্বতটিকে জাবাল আন-নূর ("আলোর পাহাড়" বা "আলোকিত পর্বত") উপাধি দেওয়া হয়েছিল।
জেমি: তাহলে এটাই কী সে জাবালে নুর পর্বত?
পরিরাজ: হ্যাঁ৷
পরিরাজ: হেরা গুহা এত ছোট ও এর মধ্যকার জায়গা এত কম যে, প্রথম দেখাতেই বিস্ময়কর মনে হবে। উচ্চতায় ভালোভাবে সোজা হয়ে দাঁড়ানোও কষ্টকর। যদিও সমতল, এ স্থানেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধ্যনমগ্নে নিয়োজিত ছিলেন। গুহাটি ৩.৭ মি (১২ ফু) দীর্ঘ এবং ১.৬০ মি (৫ ফু ৩ ইঞ্চি) প্রশস্ত। এটি পর্বতের ২৭০ মি (৮৯০ ফু) উচুতে অবস্থিত।
পরিরাজ: মসজিদে হারাম থেকে পূর্ব-উত্তর কোণে ত্বায়েফ (সায়েল) রোডে মসজিদে হারাম হতে ৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। পার্শ্ববর্তী স্থান থেকে এর উচ্চতা ২৮১ মিটার, এর চূড়া উটের কুঁজের মতো এবং এর আয়তন হলো ৫ কিলোমিটার। এর কিবলার দিক বিস্তৃত ফাঁকা অংশ, যেখান থেকে মসজিদে হারাম দেখা যায়। গুহায় দৈর্ঘ্য প্রায় ৩ মিটার।
পরিরাজ: এটি ছিল সেই জায়গা যেখানে নবী মুহাম্মদ (সঃ) কে তার অনেকগুলি প্রত্যাদেশের প্রথমটি দিয়ে আশীর্বাদ করা হয়েছিল। ইসলামিক ইতিহাসে এর তাৎপর্য, এর শিখর থেকে মক্কা এবং পবিত্র মসজিদের ক্রমবর্ধমান দৃশ্যের সাথে, জাবাল আল-নূরকে বিশ্বব্যাপী তীর্থযাত্রীদের মধ্যে একটি বিখ্যাত পর্যটন স্পট করে তুলেছে। এটি মক্কার অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণ।
পরিরাজ: ৬১০ খ্রিস্টাব্দের রমজানে, হেরা গুহায় পবিত্র কুরআনের প্রথম ওহী নবী মুহাম্মদ (সাঃ) দ্বারা গৃহীত হয়েছিল। কুরআন অনুসারে এই রাতকে বলা হয় ‘শক্তির রাত’। কিংবদন্তি আছে যে, নবী মুহাম্মদ (সঃ)যখন গুহায় তার স্বাভাবিক নির্জনে পশ্চাদপসরণে ছিলেন, রমজান মাসের শেষ ১০ দিনে, হজরত জিবরীল (প্রধান দূত গ্যাব্রিয়েল) তাকে দেখতে আসেন এবং তাকে কুরআনের প্রথম আয়াত তিলাওয়াত করতে বলেছিলেন। হজ্জ্বের মৌসুমে,
জেমি: এটা মুসলমানদের কেবলা থেকে কতটুকু দূর হবে?
পরিরাজ: জাবালে নূর: জাবালে নূর পবিত্র কাবা শরীফ থেকে মাত্র দুই মাইল দূরে অবস্থিত। এর নাম হেরা গুহা হলেও বিশ্বব্যাপী জাবালে নূর বা জাবালে হেরা নামেই বেশি পরিচিত।
জেমি: জাবালে নুর মানে কী?
পরিরাজ: জাবালে নূর অর্থ হলো নূর বা আলোর পাহাড়। কেননা এ পাহাড়েই আল্লাহর পক্ষ থেকে হজরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর ওপর সর্বপ্রথম বরকতময় আলোকিত কোরআন মজিদ নাজিল হয়। যা শুধু মুসলিম উম্মাহ নয় বরং বিশ্ব মানবতার জন্য নূর বা আলো। সে কারণেই এ পাহাড় বিশ্বব্যাপী জাবালে নূর নামেই পরিচিত।
পরিরাজ: এই গুহাটি তীর্থযাত্রীদের দ্বারা সবচেয়ে বেশি পরিদর্শন করা হয়, তবে ওমরাহ চলাকালীন, যাত্রীরা গুহায় যাওয়া বাধ্যতামূলক করে না। মহানবী
মুহাম্মদ (সাঃ) এর অনুসারীরা পাথরে আরোহণ করে চূড়ার গুহায় পৌঁছে দোয়া চান।
পরিরাজ: তবে জাবালে নূর কিংবা গারে হেরা তথা হেরা গুহা সম্পর্কে জানতে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। জাবালে নূরে যে গুহায় বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধ্যানমগ্ন থাকতেন। সেখানে ওঠা একদমই সহজ ছিল না তখন। ছিল না উপরে ওঠার কোনো সহজ পথ বা সিঁড়ি ৷
পরিরাজ: বর্তমানে যেখানে ওঠতে শক্তিশালী ও সামর্থবান মানুষদের প্রায় ১ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়। প্রায় ১০০০ ফুট উচ্চতার ভয়ংকর পথ পাড়ি দিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় ওঠতে বেশ কয়েকবার বিশ্রাম নিতে হয়।
সমতল ভূমি থেকে পাহাড়ের ওপরের দিকে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ ফুট পথ গাড়িতে যাওয়া যায়। সেখান থেকে ৮৯০ ফুট উচ্চতায় হেরা গুহা অবস্থিত।
পরিরাজ: হেরা গুহায় যেতে আরও প্রায় ১০০ ফুট রাস্তা পাড়ি দিতে হয়।
কেননা পাহাড়ের চড়ূা থেকে বিপরীত দিকে একটু নিচে অবস্থিত হেরা গুহায় যাওয়া বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।
জেমি: তাহলে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কীভাবে সেখানে যেতেন ?
পরিরাজ : সেটাই তো নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুজেযা বৈ আর কী? তিনি ঈমানের বদৌলতে মনের শক্তির জোরেই সেখানে যেতে সক্ষম হয়েছেন ৷
পরিরাজ: হেরা গুহাটি পাহাড়ের সর্বোচ্চ চুড়ায় না হলেও সেখানে যেতে হলে পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় ওঠতে হয়। সেখানে ওঠা ছাড়া হেরা গুহায় যাওয়ার কোনো বিকল্প পথ নেই।
পরিরাজ: প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে গুহায় ধ্যান করেছিলেন, সেটি আকারে অনেক ছোট। যেখানে একজন সুঠামদেহী মানুষ ঠিকভাবে নড়াচড়া করতেই কষ্টকর হয়ে যায়। অনেকেই প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্মৃতিবিজড়িত এ পাহাড় দেখতে যায় এবং হেরা গুহায় নামাজ আদায় করে। এখানে একজনের বেশি লোক নামাজ আদায় করা কষ্টকর হয়ে যায়।
পরিরাজ : এককথায় বলা যায় এটা একটি রহস্যময় পাহাড়! এর রহস্য হচ্ছে, হেরা পাহাড়, সেই পাহাড় যেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে ইবাদতের জন্য নির্জনতা অবলম্বন করতেন। সেখানে জিবরীল আলাইহিস সালাম অবতরণ করেন এবং সে হেরা গুহায় সর্বপ্রথম ওহি অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ তা‘আলার বাণী: [১] “তুমি পড় তোমার সেই রব্বের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে রক্তপিণ্ড থেকে। পড় এবং তোমার রব্ব মহামহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে (এমন জ্ঞান) যা সে জানতো না।”
পরিরাজ: [২] উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, প্রথম দিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অহী প্রাপ্ত হন নিদ্রাযোগে সঠিক স্বপ্নের মধ্যে। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন তা প্রত্যুষের আলো সদৃশ স্পষ্ট হয়ে দেখা দিত। অতঃপর তাঁর নিকট নির্জন ও নিঃসঙ্গ পরিবেশ পছন্দ হয়। কাজেই তিনি একাধারে কয়েক দিন পর্যন্ত নিজ পরিবারে অবস্থান না করে হেরা পর্বতের গুহায় নির্জন পরিবেশে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকেন। আর এই উদ্দেশ্যে তিনি প্রয়োজনীয় খাদ্যসমাগ্রী সাথে নিয়ে যেতেন। তারপর তিনি তাঁর জীবন সঙ্গিনী মহিয়সী বিবি খাদীজার নিকট ফিরে এসে আবার কয়েক দিনের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী নিয়ে যেতেন। এভাবে হেরা গুহায় অবস্থানকালে তাঁর নিকট প্রকৃত সত্য (আল্লাহর অহী) সমাগত হয়। (আল্লাহর) ফিরিশতা জিবরীল আলাইহিস সালাম সেখানে আগমনপূর্বক তাঁকে বললেন, আপনি পড়ুন! রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি বললাম, আমি
তো পড়তে জানি না!
নবী (সাঃ) বললেন, তখন আমাকে ফিরিশতা জিবরীল (আলাইহিস সালাম) জড়িয়ে ধরে এত কঠিনভাবে আলিঙ্গন করলেন যে তাতে আমি ভীষণ কষ্ট অনুভব করলাম। অতঃপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, আপনি পড়ুন! তখন আমি পূর্বের ন্যায় বললাম, আমি তো পড়তে জানি না! তখন তিনি দ্বিতীয়বার আমাকে জড়িয়ে ধরে এত কঠিনভাবে আলিঙ্গন করলেন যে তাতে আমি ভীষণ কষ্ট অনুভব করলাম। তারপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, আপনি পড়ুন! আমি পূর্বানুরূপ তখনও বললাম, আমিতো পড়তে জানি না। তখন তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে তৃতীয়বার আলিঙ্গন করে ছেড়ে দিলেন। তারপর তিনি বললেন: “আপনি আপনার রব্বের নামে পড়ুন, যিনি সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট বাঁধা রক্ত হতে। আপনি পড়ুন ! আর আপনার রব্ব মহামহিমান্বিত!”
পরিরাজ: তারপর [৩] “এ আয়াত নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সঃ) ফিরে এলেন। তাঁর অন্তর তখন কাঁপছিল। তিনি খাদীজা বিনতে খুওয়ালিদের কাছে এসে বললেন, আমাকে চাঁদর দিয়ে ঢেকে দাও, আমাকে চাঁদর দিয়ে ঢেকে দাও। ’ তাঁরা তাঁকে চাঁদর দিয়ে ঢেকে দিলেন। অবশেষে তাঁর ভয় দূর হল। তখন তিনি খাদীজা(রাঃ) এর কাছে সকল ঘটনা জানিয়ে তাঁকে বললেন, আমি নিজের উপর আশংকা বোধ করছি। খাদীজা (রাঃ) বললেন, আল্লাহ্র কসম, কক্ষনো না। আল্লাহ্ আপনাকে কক্ষনো অপমানিত করবেন না। আপনিতো আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করেন, অসহায় দুর্বলের দায়িত্ব বহন করেন, নিঃস্বকে সাহায্য করেন, মেহমানের মেহমানদারী করেন এবং দুর্দশাগ্রস্তকে সাহায্য করেন। এরপর তাঁকে নিয়ে খাদীজা (রাঃ) তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনু নাওফিল(অথবা নাওফাল) ইবনু আবদুল আসা’দ ইবনু আবদুল উযযার কাছে গেলেন, যিনি জাহিলী যুগে ঈসায়ী ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ইবরানী(হিব্রু) ভাষা লিখতে জানতেন এবং আল্লাহ্র তওফীক অনুযায়ী ইবরানী ভাষায় ইঞ্জিল থেকে অনুবাদ করতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বয়োবৃদ্ধ এবং অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। খাদীজা (রাঃ) তাঁকে বললেন, হে চাচাতো ভাই! আপনার ভাতিজার কথা শুনুন। ’ ওয়ারাকা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ভাতিজা! তুমি কী দেখ?’ রাসুলুল্লাহ (সঃ) যা যা দেখেছিলেন, সবই খুলে বললেন।
তখন ওয়ারাকা তাঁকে বললেন, ইনি সে দূত যাঁকে আল্লাহ্ মূসা(আঃ) এর কাছে পাঠিয়েছিলেন। আফসোস! আমি যদি সেদিন যুবক থাকতাম। আফসোস! আমি যদি সেদিন জীবিত থাকতাম, যেদিন তোমার কাওম তোমাকে বের করে দেবে। ’ রাসুলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ তাঁরা কি আমাকে বের করে দিবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, অতীতে যিনিই তোমার মত কিছু নিয়ে এসেছেন তাঁর সঙ্গেই শত্রুতা করা হয়েছে। সেদিন যদি আমি থাকি, তবে তোমাকে প্রবলভাবে সাহায্য করব। ’ এর কিছুদিন পর ওয়ারাকা(রাঃ) ইন্তেকাল করেন। ”
পরিরাজ: খ্রিষ্টান মিশনারীরা আলোচ্য ঘটনার ব্যাপারে বেশ কিছু অভিযোগ করে। ইসলামকে অপমান করবার মানসে নাস্তিক-মুক্তমনাদেরকেও তাদের পালে হাওয়া দিতে দেখা যায়।
জেমি : তারা কী বলে , আর তাদের অভিযোগগুলো কী কী?
পরিরাজ: তাদের অভিযোগগুলো হচ্ছে---
এক নং অভিযোগ : বাইবেলে পুরাতন নিয়মে(Old testament) তাওরাত অংশে [১ম ৫টি বই/Pentateuch] মুসা(আঃ) এর কাহিনীর কোথাও জিব্রাঈল(আঃ) এর কথা উল্লেখ নেই। বাইবেলে জিব্রাঈল(আঃ) এর সর্বপ্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় তাওরাতের শত শত বছর পর লিখিত দানিয়েল(Daniel) পুস্তকে। [৪]
পরিরাজ: অথচ ওয়ারাকা বিন নাওফাল দাবি করেছিলেন যে মুহাম্মাদ (সাঃ) এর নিকট সেই নামুস বা দূত এসেছিল যিনি মুসা(আঃ) এর নিকটেও আসতেন।
ইসলাম বিরোধীদের দাবি হচ্ছে—ওয়ারাকা বিন নাওফাল ভুল-ভাল তথ্য দিয়ে নিজ অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। অর্থাৎ নবী(সাঃ)কে প্রথম নবুয়তের সুসংবাদদানকারী ব্যক্তি ভুল তথ্য দিয়ে তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন (নাউযুবিল্লাহ)।
পরিরাজ: তাদের দুই নং অভিযোগ : তাদের আরেকটি অভিযোগ হচ্ছে-- ওয়ারাকা বিন নাওফাল যেহেতু প্রাচীন কিতাব সম্পর্কে জানতেন, কাজেই তিনিই মুহাম্মাদ(সাঃ)কে শিক্ষা দিতেন এবং এরই আলোকে মুহাম্মাদ(সাঃ) কুরআন ‘লিখতেন’ (নাউযুবিল্লাহ)।
পরিরাজ: ইসলামবিদ্বেষীদের অপপ্রচার এর এক নং অভিযোগের জবাবে বলা হয় ওয়ারাকা বিন নাওফাল সম্পর্কে যতটুকু তথ্য জানা যায়, তা থেকে আমরা বলতে পারি যে তিনি Ebionite কিংবা এই জাতীয় কোন খ্রিষ্টান চার্চের অনুসারী ছিলেন।
জেমি: Ebionite রা আবার কারা ?
পরিরাজ: শুরুতেই আমরা Ebioniteদের ব্যাপারে জেনে নিই। সেই যুগে আরব উপদ্বীপে যে সকল খ্রিষ্টান ফির্কা বা দল(denomination) ছিল, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে এই Ebionite দলটি। [৫]
পরিরাজ: তৎকালিন শাম অঞ্চল অর্থাৎ বর্তমান বৃহত্তর সিরিয়া-ফিলিস্তিন অঞ্চলে ছিল এদের আধিক্য। [৬]
পরিরাজ: তাদের নিজস্ব ইঞ্জিল(Gospel) ছিল যা Ebionite Gospel নামে পরিচিত। এর সাথে অন্য খ্রিষ্টানদের ইঞ্জিলের মিল ছিল না। তারা একে হিব্রু বা ইব্রানী ইঞ্জিল বলত কারণ তা ছিল হিব্রু ভাষায় লিখিত। [৭]
এই ইঞ্জিলের হদিস বর্তমানে আর পাওয়া যায় না। [৮]
খ্রিষ্টীয় ১ম শতাব্দী থেকেই এই দলটির অস্তিত্ব ছিল; তারা এক আল্লাহতে বিশ্বাস করত, ঈসা(আঃ)কে আল্লাহর শরিক সাব্যস্ত না করে আল্লাহর নবী বলে মানত, ত্রিত্ববাদকে অস্বীকার করত, সাধু পল(Paul)কে ধর্মত্যাগী ও বিশ্বাসঘাতক মনে করত। অন্য খ্রিষ্টানরা যেমন ঈসা(আঃ) এর তথাকথিত ক্রুশবিদ্ধ হওয়াকে নাজাতের উপায় হিসাবে মানত সেখানে Ebioniteরা কঠোরভাবে ইহুদিদের আইন-কানুন বা তাওরাতের আইনকে মেনে চলত এবং ঈসা(আঃ) এর মৃত্যুকে পাপ থেকে নাজাতের(atonement for sin) উপায় মানতে অস্বীকার করত। [৯]
পরবর্তীতে এই খ্রিষ্টান দলটির সদস্যরা মুহাম্মাদ(সাঃ)কে সত্য নবী হিসাবে মেনে নেয় এবং ইসলাম গ্রহণ করে। [১০]
পরিরাজ: শুরুতে বুখারীর যে হাদিসটি উল্লেখ করা হয়েছে তাতে বলা আছে যে, “ তিনি(ওয়ারাকা) ইবরানী(হিব্রু) ভাষা লিখতে জানতেন এবং আল্লাহ্র তওফীক অনুযায়ী ইবরানী ভাষায় ইঞ্জিল থেকে অনুবাদ করতেন।“ আমরা উপরে দেখেছি যে Ebionite খ্রিষ্টানদের ইঞ্জিল ছিল হিব্রু বা ইবরানী ভাষায়। Ebionite খ্রিষ্টানরা ছিল একত্ববাদী।
পরিরাজ: সিরাত ইবন হিশামে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ওয়ারাকা বিন নাওফাল ছিলেন চারজন সত্য ধর্ম অনুসন্ধানকারীর একজন যাঁরা সমকালিন আরব পৌত্তলিকদের মূর্তিপুজার বিরোধিতা করতেন। তারা সেই পৌত্তলিক ও বহুঈশ্বরবাদী ধর্ম ত্যাগ করে একত্ববাদী ইব্রাহিমী ধর্মবিশ্বাস অনুসন্ধান করছিলেন। এভাবে অনুসন্ধান করে তিনি ঈসা(আঃ) এর দ্বীন গ্রহণ করেন এবং বিভিন্ন বইপুস্তক অধ্যায়ন করতে থাকেন। [১১]
পরিরাজ: তাই আমরা বলতে পারি যে ওয়ারাকা বিন নাওফাল Ebionite ছিলেন কিংবা এমন ফির্কার খ্রিষ্টান ছিলেন যারা ছিল একত্ববাদী। [১২]
পরিরাজ: আমরা জেনেছি যে Ebionite খ্রিষ্টানরা কঠোরভাবে তাওরাত অনুসারী ছিল। যেহেতু তারা তাওরাতের আইন মেনে চলত কাজেই স্বাভাবিকভাবেই তাদের প্রয়োজন হত ইহুদিদের পূর্ণ তাওরাত সম্পর্কে জ্ঞান লাভের। ইহুদিদের বিশ্বাস হচ্ছেঃ-- ঈশ্বর মুসা(আঃ)কে তাওরাত দান করেছেন। এই তাওরাতের ২টি রূপ আছে; লিখিত ও মৌখিক। ইহুদিদের ‘তানাখ’{খ্রিষ্টানরাও এই কিতাবগুলোতে বিশ্বাস রাখে এবং এগুলো Old Testament হিসাবে বাইবেলে আছে} এর প্রথম ৫টি বই হচ্ছে ‘লিখিত তাওরাত’(written Torah)। আর মুসা(আঃ)কে ঈশ্বর যে মৌখিক শিক্ষা দিয়েছেন তা হচ্ছে ‘মৌখিক তাওরাত’(oral Torah)। এই ‘মৌখিক তাওরাত’কে পরবর্তীতে লিপিবদ্ধ করা হয়, যা ‘মিশনাহ’ (Mishnah) নামে পরিচিত। অর্থাৎ ‘মৌখিক তাওরাত’ এর লিখিত রূপ হচ্ছে মিশনাহ। ইহুদি পণ্ডিতগণ মিশনাহ এর বেশ কিছু ব্যাখ্যা লেখেন যা ‘গেমারা’(Gemara) নামে পরিচিত। মিশনাহ ও গেমারাকে একত্রে বলে ‘তালমুদ’(Talmud)। [১৩]
পরিরাজ: মূল ধারার খ্রিষ্টানরা তাওরাতের আইন মানেন না এবং তারা ইহুদিদের মৌখিক তাওরাতকে বাইবেলে অন্তর্ভুক্ত করেননি। কিন্তু ওয়ারাকা বিন নাওফালের পক্ষে অবশ্যই মৌখিক তাওরাতের জ্ঞান থাকা সম্ভব ছিল অথবা বলা যায় প্রয়োজন ছিল। কেননা তিনি ছিলেন Ebionite ধারার খ্রিষ্টান।
জেমি: মৌখিক তাওরাতে মুসা(আঃ) এবং জিব্রাঈল(আঃ) এর ব্যাপারে কী তথ্য আছে?
পরিরাজ: ইহুদিদের মৌখিক তাওরাতের বিবরণ অনুযায়ী--- নবী মুসা(আ:) এর জীবনে সব থেকে বেশি প্রভাব যাঁদের ছিল তাঁদের একজন হচ্ছেন ফেরেশতা জিব্রাঈল(আঃ)।
পরিরাজ: মৌখিক তাওরাতের বিবরণ অনুযায়ী মুসা(আঃ) শিশুকাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে জিব্রাঈল(আঃ) এর সংস্পর্শে এসেছেন। মুসা(আঃ) কে তাঁর মা নীল নদে ভাসিয়ে দিলে সেটি ভাসতে ভাসতে ফিরআউনের প্রাসাদের কাছে চলে আসে। মৌখিক তাওরাত বলছে যে, সে সময় জিব্রাঈল(আঃ) শিশু মুসা(আঃ)কে খোঁচা দেন যার দরুণ তিনি কেঁদে ওঠেন। আর সেই কান্নার কারণেই ফিরআউনের কন্যার মনে শিশু মুসা(আঃ) এর প্রতি দয়ার উদ্রেক ঘটে। [১৪]
এবং তিনি মুসা(আঃ)কে তুলে নিয়ে লালনপালন করেন। পরবর্তীতে ফিরআউন শিশু মুসা(আঃ) এর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড দেখে সন্দেহগ্রস্ত হয়ে পড়ে যে এ কোন অসাধারণ শিশু। জ্যোতিষী তাকে জানায় যে এ হচ্ছে সেই শিশু যে বড় হয়ে তার সাম্রাজ্যের ধ্বংসের কারণ হবে। ফিরআউনের একজন উপদেষ্টা(Balaam) পরামর্শ দেয় শিশু মুসা(আঃ)কে হত্যা করতে। এ অবস্থায় তাঁর প্রাণরক্ষার ব্যাবস্থা করেন জিব্রাঈল(আঃ)। ফেরেশতা জিব্রাঈল (আজিব্রাঈল (আঃ) ফিরআউনের একজন উপদেষ্টার(Jethro ) ছদ্মবেশ নিয়ে ফিরআউনকে পরামর্শ দেন যে, পরীক্ষা করে দেখা হোক এ আসলেই কোন অসাধারণ শিশু কিনা। সকলেই এ পরামর্শে একমত হয়।
পরিরাজ: তখন পরীক্ষা করার জন্য একটি অতি উজ্জ্বল স্বর্ণের খণ্ড এবং একটি জ্বলন্ত কয়লার টুকরাকে পাশাপাশি একটা থালায় রেখে মুসা(আঃ) এর নিকট আনা হয়। উদ্যেশ্য ছিল এটা দেখা যে শিশুটি কোন জিনিসটা তুলে নেয়। যদি সে অবুঝ শিশু হয় তাহলে অপেক্ষাকৃত বেশি উজ্জ্বল কয়লার টুকরা তুলে নেবে। আর যদি অসাধারণ কোন শিশু হয়, তাহলে বুঝেশুনে স্বর্ণের টুকরাটা তুলে নেবে। এমনটি করলে তাঁকে হত্যা করা হবে।
পরিরাজ: জিব্রাঈল শিশু মুসা(আঃ) এর হাতকে জ্বলন্ত কয়লার টুকরাটির দিকে চালিত করলেন। ফলে তিনি কয়লার টুকরাটি তুলে নেন এবং মুখে দেন। ফলে তাঁর জিহ্বা পুড়ে যায়। এর ফলশ্রুতিতেই তিনি পরবর্তীতে তোতলা হয়ে যান। এতে তিনি আহত হয়েছিলেন, কিন্তু প্রাণ রক্ষা পেয়েছিল।
পরিরাজ: মৌখিক তাওরাতের অন্যত্র বলা আছে যে, মুসা(আঃ) নবুয়ত পাবার পর হারুন(আঃ)কে নিয়ে যখন ফিরআউনের নিকট যাচ্ছিলেন, সেখানকার প্রাসাদের প্রতিটি দরজায় প্রহরী ছিল। জিব্রাঈল(আঃ) তাঁদেরকে অদৃশ্য হয়ে প্রাসাদের ভেতর প্রবেশ করিয়ে দেন।
পরিরাজ: মৌখিক তাওরাতের বিবরণ অনুযায়ী মৃত্যুর সময় মুসা(আঃ) এর জান কবজ করতে আসেন যেসব ফেরেশতা, তাঁদের মধ্যে জিব্রাঈল(আঃ)ও ছিলেন। তিনি সে সময়ে মুসা(আঃ) এর বিছানা ঠিক করে দেন। [১৫]
পরিরাজ: আমরা জেনেছি যে ইহুদিদের আইন সংক্রান্ত কিতাবাদীতে বেশ কয়েক জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে যে মুসা(আঃ) এর নিকট জিব্রাঈল(আঃ) আসতেন। কাজেই ওয়ারাকা বিন নাওফালের এই উক্তিঃ “...ইনি সে দূত [জিব্রাঈল(আঃ)] যাঁকে আল্লাহ্ মূসা(আঃ) এর কাছে পাঠিয়েছিলেন” সম্পূর্ণ সঠিক একটি উক্তি এবং এর মাঝে ভুলের কিছুই নেই। নিঃসন্দেহে আসমানী কিতাবে অভিজ্ঞ ব্যক্তি ওয়ারাকা বিন নাওফালের পক্ষে মৌখিক তাওরাত এবং মিদরাসে উল্লেখিত মুসা(আঃ) ও জিব্রাঈল(আঃ) এর ঘটনাগুলো জানা থাকার কথা, Ebonite খ্রিষ্টান পণ্ডিতদের পক্ষে এগুলো জানা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। বরং যে সব খ্রিষ্টান মিশনারীরা এখান থেকে ভুল ধরতে যায়, তাদেরই অজ্ঞতা এর দ্বারা প্রকাশ পাচ্ছে। কেননা ইহুদিদের আইন সংক্রান্ত কিতাবাদীতে মুসা(আঃ) এর নিকট জিব্রাঈল(আঃ) এর আসার ঘটনাগুলো জানেন না বলেই তারা এমন অভিযোগ করেছেন। না জেনেই তারা দাবি করেন যে দানিয়েলের পুস্তকের আগে কোথাও মুসা(আঃ) এর নিকট জিব্রাঈল(আঃ) এর আসার উল্লেখ নেই। অথবা এটাও হতে পারে যে খ্রিষ্টান মিশনারীরা এই ঘটনাগুলো জেনেশুনেই ইসলামের প্রতি শত্রুতাবশত এমন অভিযোগ করেন।
পরিরাজ: দুই নং অভিযোগের জবাব হচ্ছে, খ্রিষ্টান মিশনারীরা বলতে চায় যে ওয়ারাকা বিন নাওফাল যেহেতু প্রাচীন আসমানী কিতাবে অভিজ্ঞ ছিলেন, কাজেই তিনিই মুহাম্মাদ (সঃ)কে শিখিয়ে দিতেন যা দ্বারা মুহাম্মাদ (সাঃ) কুরআন ‘রচনা’ করতেন (নাউযুবিল্লাহ)। তাদের সাথে নাস্তিক-মুক্তমনাদেরকেও তাল মেলাতে দেখা যায়।
পরিরাজ: এটি এমনই একটি মূর্খতাপ্রসূত অভিযোগ যা খুব সহজেই খণ্ডন করা যায়। তাছাড়া এই অভিযোগটি একটি স্ববিরোধী অভিযোগ। এরাই দাবি করে যে ওয়ারাকা বিন নাওফাল মুসা(আঃ) এর নিকট জিব্রাঈল(আঃ) এর আসবার ব্যাপারে ‘ভুল’ তথ্য দিয়ে নিজ অজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন। তারা যখন প্রয়োজন হয় তখন ওয়ারাকা বিন নাওফালকে ‘অজ্ঞ’ প্রমাণ করেন,
পরিরাজ: আবার যখন প্রয়োজন হয় তখন সেই ওয়ারাকা বিন নাওফালকেই আসমানী কিতাবে জ্ঞানী প্রমাণ করতে চান যাতে বলা যায় যে তিনি কুরআন ‘রচনায়’ মুহাম্মাদ(সাঃ)কে সাহায্য করতেন। সত্যিই বড় বিচিত্র কর্মপ্রচেষ্টা ইসলাম বিরোধী এই মানুষগুলোর।
পরিরাজ: শুরুতেই মুহাম্মাদ(সাঃ) এর সঙ্গে ওয়ারাকার সাক্ষাতের ঘটনা নিয়ে একটি হাদিস উল্লেখ করা হয়েছিল যার শেষাংশে বলা হয়েছে – “... এর কিছুদিন পর ওয়ারাকা(রাঁ) ইন্তেকাল করেন। …” [১৬]
পরিরাজ: অর্থাৎ মুহাম্মাদ(সাঃ) প্রথম ওহী{সুরা আলাকের ১ম ৫টি আয়াত} লাভের কিছুদিনের মাঝেই ওয়ারাকা ইন্তেকাল করেন। অথচ মুহাম্মাদ(সাঃ) এর নিকট এরপরেও টানা ২৩ বছর কুরআন নাজিল হতে থাকে। ওয়ারাকা তাহলে কী করে মুহাম্মাদ(সাঃ)কে “কুরআন শিক্ষা” দিতেন? মৃত মানুষ কি কাউকে কিছু শেখাতে পারে?
পরিরাজ: আমরা জানি যে বিভিন্ন অবস্থা ও ঘটনার প্রেক্ষিতে কুরআনের আয়াত নাজিল হত। এছাড়াও মুহাম্মাদ(সাঃ) এর নিকট অনেক সময়েই আহলে কিতাব ইহুদিরা বিভিন্ন প্রশ্ন ছুড়ে দিত। ইহুদিরা নিজেরাই বলত যে, সেগুলো এমন প্রশ্ন ছিল যার জবাব একজন নবী ছাড়া কেউ দিতে পারে না।
জেমি: সেগুলো কী রকম প্রশ্ন ছিল?
পরিরাজ: ইহুদিরা পরীক্ষার্থে রাসুলুল্লাহ(সাঃ) কে বলেছিলঃ যদি আপনি সত্যিই আল্লাহর নবী হন, তবে বলুন ইয়াকুব পরিবার শাম থেকে মিসরে কেন স্থানান্তরিত হয়েছিল এবং ইউসুফ(আঃ) এর ঘটনা কী ছিল? প্রত্যুত্তরে ওহীর(সুরা ইউসুফ) মাধ্যমে পূর্ণ কাহিনী অবতারণ করা হয়।...তিনি ছিলেন নিরক্ষর এবং জীবনের প্রথম থেকেই মক্কায় বসবাসকারী।তিনি কারো কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেননি এবং কোন গ্রন্থও পাঠ করেননি।এতদসত্ত্বেও তাওরাতে বর্ণিত আদ্যোপান্ত ঘটনাটি বিশুদ্ধরূপে বর্ণণা করে দেন।বরং এমন কিছু বিষয়ও তিনি বর্ণণা করেন যেগুলো তাওরাতে উল্লেখ ছিল না। [১৭]
পরিরাজ: “এরপর ইহুদি(আলেম) বলল, আমি আপনাকে (কয়েকটি কথা) জিজ্ঞেস করতে এসেছি। রাসূলুল্লাহ(সাঃ) তাকে বললেন, তোমার কী লাভ হবে, যদি আমি তোমাকে কিছু বলি? সে বলল, আমি আমার কান পেতে শুনব।
এরপর রাসূলুল্লাহ(সাঃ) তাঁর কাছে যে খড়িটি ছিল তা দিয়ে মাটিতে আঁকাঝোকা দাগ কাটছিলেন। তারপর বললেন, জিজ্ঞেস কর।
পরিরাজ:`ইহুদি বলল, যেদিন এ জমিন ও আকাশমণ্ডলী পাল্টে গিয়ে অন্য জমিন ও আকাশমণ্ডলীতে পরিণত হবে (অর্থাৎ কিয়ামাত হবে) সেদিন লোকজন কোথায় থাকবে?
পরিরাজ: জবাবে রাসূলুল্লাহ(সাঃ) বললেন, তারা সেদিন পুলসিরাতের কাছে অন্ধকারে থাকবে।
পরিরাজ: তারপর সে [ইহুদি আলেম] বলল, কে সর্বপ্রথম (তা পার হবার) অনুমতি লাভ করবে?
পরিরাজ: তিনি[রাসূলুল্লাহ(সাঃ)] বললেন, দরিদ্র মুহাজিরগণ।
পরিরাজ: ইহুদি বলল, জান্নাতে যখন তারা প্রবেশ করবে তখন তাদের তোহফা কি হবে?
পরিরাজ: নবী (সাঃ) বললেন, মাছের কলিজার টুকরা।
পরিরাজ: ইহুদি বলল, এরপর তাদের দুপুরের খাদ্য কি হবে?
পরিরাজ: নবী (সাঃ) বললেন, তাদের জন্য জান্নাতের ষাঁড় জবাই করা হবে যা জান্নাতের আশেপাশে চড়ে বেড়ায়।
পরিরাজ: ইহুদি বলল, এরপরে তাদের পানীয় কি হবে?
পরিরাজ: নবী (সাঃ) বললেন, সেখানকার একটি ঝর্ণার পানি যার নাম সালসাবীল।
পরিরাজ: তখন ইহুদি বলল, আপনি ঠিক বলেছেন। সে আরো বলল যে, আমি আপনার কাছে এমন একটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে এসেছি যা নবী ছাড়া পৃথিবীর কোন অধিবাসী জানে না অথবা একজন কি দু'জন লোক ছাড়া।
পরিরাজ: তখন নবী (সাঃ) বললেন, আমি যদি তোমাকে তা বলে দেই তবে তোমার কি কোন উপকার হবে?
পরিরাজ: ইহুদি বলল, আমি আমার কান পেতে শুনব। সে বলল, আমি আপনাকে সন্তান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে এসেছি।
পরিরাজ: নবী ( সাঃ) বললেন, পুরুষের বীর্য সাদা এবং মেয়েলোকের বীর্য হলুদ। যখন উভয়টি একত্রিত হয়ে যায় এবং পুরুষের বীর্য মেয়েলোকের বীর্যের উপর প্রাধান্য লাভ করে তখন আল্লাহর হুকুমে পুত্র সন্তান হয়। আর যখন মেয়েলোকের বীর্য পুরুষের বীর্যের ওপর প্রধান্য লাভ করে তখন আল্লাহর হুকুমে কন্যা সন্তান হয়।
পরিরাজ: তখন ইহুদি বলল, আপনি ঠিকই বলেছেন এবং নিশ্চয়ই আপনি একজন নবী। এরপর সে চলে গেল।
পরিরাজ: তখন রাসূলুল্লাহ(সাঃ) বললেন, এ লোক আমার কাছে যা জিজ্ঞেস করেছে, ইতোপূর্বে আমার সে সম্পর্কে কোন জ্ঞানই ছিল না। আল্লাহ তা'আলা এক্ষণে আমাকে তা জানিয়ে দিলেন। [১৮]
পরিরাজ: এ রকম আরও অনেক ঘটনা আছে যখন অন্য ধর্মের পণ্ডিতরা নবী(সাঃ)কে বিভিন্ন প্রশ্ন করত এবং তিনি তাৎক্ষণিকভাবে তার সঠিক উত্তর দিতেন। ওয়ারাকা বিন নাওফালই যদি তাঁকে শিখিয়ে দিয়ে থাকতেন (নাউযুবিল্লাহ), তাহলে কী করে মুহাম্মাদ(সাঃ) তাৎক্ষণিকভাবে সেগুলোর উত্তর দিতেন?
পরিরাজ: সব থেকে বড় কথা এসব ঘটনার বহু আগেই ওয়ারাকা বিন নাওফাল মারা গিয়েছিলেন। কাজেই মুহাম্মাদ(সাঃ)কে সকল কিছু ওয়ারাকা বিন নাওফাল শিখিয়ে দিতেন—এ অভিযোগের আদৌ কোন ভিত্তি নেই।
জেমি: তাহলে ইসলামে ওয়ারাকা বিন নাওফেলের মর্যাদা কী?
পরিরাজ: ইসলামে ওয়ারাকা বিন নাওফালের মর্যাদা হচ্ছে; সহীহ হাদিসে উল্লেখ আছে যে ওয়ারাকা বিন নাওফাল একজন জান্নাতী। আয়িশা(রাঃ) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ(সাঃ) বলেছেনঃ “তোমরা ওয়ারাকা বিন নাওফালকে মন্দ বলো না কেননা আমি দেখেছি যে তিনি জান্নাতে ১টি বা ২টি উদ্যান লাভ করবেন।” [১৯]
পরিরাজ: খাদিজা(রাঃ) রাসূলুল্লাহ(সাঃ)কে ওয়ারাকা বিন নাওফালের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে নবী(সাঃ) বলেন,“আমি তাঁকে স্বপ্নে সাদা জামা পরিহিত অবস্থায় দেখেছি। তাঁর জন্য যদি জাহান্নাম নির্ধারিত হত, তাহলে আমি তাঁকে সাদা জামা পরা অবসস্থায় দেখতাম না।” [২০]
পরিরাজ: প্রাচীন আলিমদের মধ্যে ইমাম তাবারী(রাঃ), বাগাওয়ী(রঃ), ইবন কানী(রঃ), ইবন সাকান(র.) এবং আরো অনেকের মতে ওয়ারাকা বিন নাওফাল ছিলেন একজন সাহাবী।
পরিরাজ: বর্তমান যুগের আলিমদের মধ্যে শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালিহ আল উসাইমিন(রহঃ), সালিহ আল ফাওযান(হাফিজাহুল্লাহ) এর মতেও ওয়ারাকা বিন নাওফাল ছিলেন একজন সাহাবী এবং তাঁর নামের শেষে ‘রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু’{আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন} পড়া যেতে পারে।
পরিরাজ: আবার ইবন কাসির(রঃ), ইমাম যাহাবী(রঃ), ইবন হাজার(রঃ) প্রমুখের মতে ওয়ারাকা বিন নাওফাল সাহাবী ছিলেন না। [২১]
পরিরাজ: এবার শোন , হেরাগুহা সম্পর্কে বলছি;
পরিরাজ: [২২] আল্লাহর নবীর সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার হেরা পাহাড়ে অবস্থান করছেন এমন সময় পাহাড় নড়া-চড়া শুরু করে, তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: হে হেরা স্থির হও, তোমার উপর তো একজন নবী, এক সিদ্দীক ও শহীদ রয়েছেন” সে সময় তার উপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আবু বকর, উমার, উসমান, আলী, ত্বালহা, যুবায়ের ও সা‘দ ইবন আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম উপস্থিত ছিলেন।
জেমি: আচ্ছা এখানে আসলে মুসলমানদের জন্য কোন ইবাদত করতে হয় কী?
পরিরাজ: এ হেরা পাহাড়ের চূড়ায় যে গুহা রয়েছে, অহী অবতীর্ণ হওয়ার পর, এমনকি মক্কা বিজয়ের পর, কিংবা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হজের সময় বা তাঁর কোনো সাহাবী কখনও আসা-যাওয়া করেছেন বলে কোনো দলীল-প্রমাণ নেই।
পরিরাজ: এর সত্যতা সম্পর্কে ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন: [২৩] হেরা গুহায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবী হওয়ার পূর্বেই নির্জনতা গ্রহণ করত: ইবাদত করেন। অতঃপর আল্লাহ যখন তাঁকে নবুওয়াত ও রিসালাত দ্বারা সম্মানিত করলেন, সৃষ্টির ওপর তাঁর প্রতি ঈমান আনা, তাঁর অনুসরণ ও আনুগত্য ফরয করে দিলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও যারা তাঁর প্রতি ঈমান আনেন সেই সর্বোত্তম সৃষ্টি মুহাজিরগণ মক্কায় বেশ কিছু বছর অবস্থান করেন; কিন্তু সে সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে বা তাঁর কোনো সাহাবী হেরা পাহাড়ে যান নি। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরত করেন ও চারবার উমরা করেন। অথচ সেগুলোর কোনোটিতে না রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, না তাঁর কোনো সাহাবী হেরা গুহায় আগমন করেন, না সেখানে তারা যিয়ারত করেন, না মক্কার পার্শ্ববর্তী কোনো স্থানের কোনো অংশ তাঁরা যিয়ারত করেন। অতএব, সেখানে মসজিদে হারাম, সাফা-মারওয়ার মধ্যবর্তী স্থান, মিনা, মুযদালিফা ও ‘আরাফাত ব্যতীত আর কোনো স্থানে কোনো ধরণের ইবাদত নেই।
পরিরাজ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরবর্তীতে খোলাফায়ে রাশেদীন ও অন্যান্য মহান উত্তরসূরীগণ অতিবাহিত হয়েছেন তারা হেরা গুহা বা এ ধরণের অন্য কোথাও সালাত বা দো‘আর জন্য গমন করেন নি।
পরিরাজ: আর সর্বজনবিদিত যে, যদি তা শরী‘আতসম্মত হত বা এমন মুস্তাহাব আমলের অন্তর্ভুক্ত হত যাতে আল্লাহ নেকী দিবেন তবে এ ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মানুষ অপেক্ষা বেশি জানতেন ও সাহাবীগণও এ সম্পর্কে জানতেন। আর সাহাবীগণ ছিলেন নেকীর কাজসমূহের ক্ষেত্র সর্বাধিক অবগত ও আগ্রহী। তা সত্ত্বেও যেহেতু তারা এ সবের কোনো কিছুর প্রতি ভ্রুক্ষেপ করেন নি, তাতে বুঝা যায় যে, এ পর্বত বা এ জাতীয় কোনো স্থানে গিয়ে ইবাদত করা হচ্ছে সেই সব নতুন নতুন আবিস্কৃত বিদ‘আতসমূহের অন্তর্ভুক্ত; যেগুলোকে তারা কোনো ইবাদত, নৈকট্য অর্জনের উপায় বা অনুসরণযোগ্য গণ্য করতেন না। সুতরাং যে সেগুলোকে কোনো ইবাদত, নৈকট্য অর্জনের উপায় বা অনুসরণযোগ্য গণ্য করল সে অবশ্যই তাদের হক পথের অনুসরণ পরিত্যাগ করে অন্য ভ্রান্ত পথের অনুসরণ করল এবং এমন নিয়ম-নীতি প্রবর্তন করল যার অনুমতি আল্লাহ প্রদান করেন নি।
পরিরাজ: হেরা পাহাড়ে কোনো কোনো হাজী বেশ কিছু বিদ‘আত ও সুন্নাত পরিপন্থী কার্যকলাপে পতিত হয়। আর তার কারণ হলো, এ পাহাড়ের পবিত্রতা ও ভিন্ন মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য আছে বলে তাদের ভ্রান্ত ধারণা, যার ভ্রান্ততা সম্পর্কে ইতোপূর্বে সতর্ক করা হয়েছে। হাজীগণ যেন এ সমস্ত বিদ‘আত ও কুসংস্কারে পতিত হওয়া থেকে সতর্ক থাকে এজন্য নিম্নে তার কতিপয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হলো:
পরিরাজ: নেকীর উদ্দেশ্যে হেরা পাহাড় যিয়ারত করা, তার উপর আরোহণ ও তার পবিত্রতা ও ভিন্ন মর্যাদার বিশ্বাস পোষণ করা। হেরা পাহাড়কে কিবলা করে উভয় হাত উঠিয়ে খুব করে দো‘আ করা। সেখানে সালাত আদায় করা। তার উপর বিভিন্ন নাম বা অন্য কিছু লেখা-লেখি করা। সেখানে ত্বাওয়াফ করা। সেখানকার গাছ-পালা ও পাথর দ্বারা বরকত গ্রহণ ও সেগুলোতে নেকড়া, সূতা বাঁধা। বিভিন্ন ভ্রান্ত বিশ্বাসে যেমন, যেন বার বার সেখানে আগমন করতে পারে। অমুক ব্যক্তি হজ করতে পারে, রোগ-ব্যাধি মুক্ত হয়, সন্তান প্রসব হয় না এমন মহিলার যেন সন্তান প্রসব হয় ইত্যাদি বিশ্বাসে ম্যাসেজ, কবিতা, চিত্র, নেকড়া ইত্যাদি স্থাপন করা, পয়সা দেওয়া। এ ধরণের বিদ‘আত ও কুসংস্কার সেখানে ঘটে থাকে অথচ যে ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা কোনো দলীল অবতীর্ণ করেন নি।
পরিরাজ: জাবালে নূর খ্যাত এই সেই ঐতিহাসিক গুহা। যেখান থেকে ওহি লাভের মাধ্যমেই প্রথম শুরু হয়েছিল প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তি দায়িত্ব পালনের কঠিন জীবনের শুভ সূচনা। কেননা তিনি যখন ওহি নিয়ে হেরা গুহা থেকে পাহাড়ের অর্ধেক নিচে নেমে আসলেন, তখন তাঁর কানে একটি কণ্ঠের আওয়াজ আসে- ‘হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহর নবী আর আমি জিবরিল।’
পরিরাজ: তিনি পৃথিবীতে নবী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনে হলেন আল্লাহ তাআলা সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী ও রাসুল(সঃ)।
পরিরাজ: হেরা গুহায় যে দিন প্রথম জিবরিল আলাইহিস সালাম ওহী নিয়ে আসলেন, সে রাতটি ছিল প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য কঠিন রাত। সে রাতে হজরত জিবরিল আলাইহিস সালাম বিদায় গ্রহণ করার আগ পর্যন্ত প্রিয় নবি যে দিকেই তাকাতেন দেখতেন হজরত জিবরিল আলাইহিস সালাম সব দিক থেকেই সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আর এতে তিনি ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে নেমে আসার সময়ই তাঁর নবুয়তি পরিচয়সহ জিবরিল নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন।
তারপর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেরা গুহা থেকে নিজ ঘরে ফিরে আসলেন এবং হজরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বললেন, আমাকে কম্বল দ্বারা আবৃত করে দাও, জড়িয়ে ধরো।
হেরা গুহা থেকে কুরআনের প্রথম ওহি নাজিল হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ ২২ বছর ৫ মাস ১৪দিন সময়ে মানব জাতির জন্য সংবিধান হিসেবে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ওহী নাজিলের মাধ্যমে পুরো কুরআনুল কারিম অবর্তীণ করেন। যার শুভ সূচনা হয়েছিল জাবালে নূর থেকেই…
পরিরাাজ: জেমি!
জেমি: জি!
পরিরাজ: তোমার সামনে এখন যে গায়রে হেরা দেখতে পাচ্ছো এটা সংস্করণ হওয়ার পরের দৃশ্য।
জেমি: এটা সংস্করণ করা হয়েছে কখন?
পরিরাজ: বলছি, একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ; করোনা পরিস্থিতির জন্য দেওয়া লকডাউনের সময় মক্কায় অবস্থিত হেরা গুহা সংস্কারের জন্য এপ্রিলের মাঝামাঝিতে মক্কা প্রদেশের শাসক যুবরাজ খালেদ আল ফয়সাল অনুমোদন দেন। সৌদির রাজকীয় কমিশন ও মক্কা প্রদেশের উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের যৌথ উদ্যোগে ও মক্কার ভারপ্রাপ্ত আমির যুবরাজ বদর বিন সুলতানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে সংস্কার কাজ শেষ হয়।
পরিরাজ: বিগত বছরগুলোতে প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজের অভাবে হেরা গুহার ব্যাপক সৌন্দর্যহানি হয়। দর্শনার্থীদের মাত্রাতিরিক্ত চলাচল ও ফেলে আসা বিভিন্ন জিনিসের কারণে মূল অবয়বও অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরেই সংস্কারের পরিকল্পনা থাকলেও স্বাভাবিক সময়ে হেরা গুহায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত হাজিদের ভীড়ের কারণে তা সম্ভব হয়নি। তাই লকডাউনের সময় সেই সংস্কার করা সম্ভব হয়েছে।
পরিরাজ: সংস্কার কাজের অংশ হিসেবে সিঁড়ি সম্প্রসারণ ও রাস্তা বড় করা হয়েছে। গুহার আশেপাশে থাকা অবাঞ্চিত পাথর সরিয়ে ফেলাসহ, বিভিন্ন পাথরের গায়ের লেখা মুছে ফেলা হয়েছে। গুহার পাশে হাজিদের ফেলে আসা নানা জিনিসপত্র, পুঁতে রাখা তাবিজ-কবজ ও অস্থায়ীভাবে নির্মিত অবকাঠামোগুলো অপসারণ করা হয়েছে।
পরিরাজ: এখন আর হেরা গুহায় কোনো লেখা বা অঙ্কন নেই। এতদিন অনেকে বিভিন্ন মান্নত পূরণের জন্য পাথরে কালি দিয়ে বিভিন্ন কিছু লিখে আসতো।
পরিরাজ: পাহাড়ের ওপর থেকে মসজিদের হারামের মিনার দেখা যায়। পাহাড়ের বড় বড় পাথরের ছোট ছোট ফাঁক দিয়ে লোকজন গুহার ভেতরে প্রবেশ করেন। গুহার প্রবেশপথ ছাড়া সবদিক পাথরবেষ্টিত। মেঝেতে রয়েছে পাথর খণ্ড, যাকে জায়নামাজ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
পরিরাজ: হেরা গুহার পাশাপাশি গারে সাত্তরেরও সংস্কার কাজ হয়েছে। হিজরতের সময় মক্কার কোরাইশ গোষ্ঠীর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নবী করিম (সাঃ) হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ)-কে নিয়ে সাওর গুহায় আত্মগোপন করেছিলেন। আল্লাহতায়ালার প্রতি নবী করিম (সাঃ)-এর অবিচল বিশ্বাস এবং হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ)-এর অসীম ধৈর্য ও প্রেমের অনন্য সাক্ষী এই পাহাড় ও গুহা।
জেমি : সত্যিই এক বিস্ময়কর কাহিনী তুমি শুনালে!
পরিরাজ: চল; তোমাকে পুরো গুহাটি দেখাই ; তারপর তোমাকে আরও বিস্ময়কর কিছু কাহিনী শুনাবো;
নবীন প্রেমের উদয়! দ্বিতীয় খণ্ড, পর্ব: দশ ,
সমাপ্ত।।
রচনাকাল: সংশোধিত ২৪ অক্টোবর ২০২২ইং
বিশেষ দ্রষ্টব্য : কপিরাইট সংরক্ষিত ৷
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন