নবীন প্রেমের উদয়! দ্বিতীয় খণ্ড
লেখক নাঈম হোসেন
পর্ব: বারো [ হুবহু জেমির বর্ণনা ;]
👩জেমি: চোখের পলক না ফেলতেই আমরা তূর পর্বতে পৌঁছে গেলাম ; আমি পাহাড়টাকে প্রথমে ভালো করে দেখলাম, জিজ্ঞেস করলাম এ পর্বতের সীমানা কতটুকু এবং এই পর্বতের বিস্ময়কর কাহিনী কী?
💂পরিরাজ: দাঁড়ি কুচকিয়ে বলছি; সিনাই পর্বত (আরবি: طور سيناء ,toor sinaa'i) (হিব্রু ভাষায়: הר סיני ,har sina'i), মিশরের একটি ধর্মীয় গুরুত্ববহ পর্বত। এটি মিশরের সিনাই উপদ্বীপের সেন্ট ক্যাথেরিন শহরে আবস্থিত। বেদুইনদের কাছে এটি হোরেব পর্বত, মুসা পর্বত, গাবাল মুসা তথা জাবাল মুসা (মুসার পর্বত) হিসেবেও পরিচিত ছিল।
💂পরিরাজ: সিনাই পর্বতের শীর্ষদৃশ্য: সর্বোচ্চ বিন্দুউচ্চতা ২,২৮৫ মিটার (৭,৪৯৭ ফুট) সুপ্রত্যক্ষতা ৩৩৪ মি (১,০৯৬ ফু) স্থানাঙ্ক ২৮°৩২′২৩″ উত্তর ৩৩°৫৮′২৪″ পূর্ব ভূগোলঅবস্থানসেন্ট ক্যাথেরিন শহর, সিনাই উপদ্বীপ, মিশর।
💂পরিরাজ: সিনাই পর্বতটির উচ্চতা ২২৮৫ মিটার। পর্বতের উপরে উঠার জন্য দুইটি রাস্তা রয়েছে। পায়ে অথবা বেদুইনদের উটের সাহায্যে উপরে উঠা যায়। পায়ে হেটে উপরে উঠাতে প্রায় তিন ঘন্টার মত লাগে।
💂পরিরাজ: পাহারের শৃঙ্গারে রয়েছে একটি গুহা, যেখানে বসে হযরত মুসা (আঃ) মহান আল্লাহ্ পাকের দেয়ানে মগ্ন থাকতেন। আরো রয়েছে দুটি ছোট রোম। একটি মুসলমানদের এবাদত করার জন্য ও অন্যটি খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের এবাদত করার জন্য।
💂পরিরাজ: লোকমুখে কথিত আছে যে, আল্লাহর নূরের তাজাল্লিতে ভস্মীভূত তুর পাহাড় থেকেই নাকি সুরমার উৎপত্তি হয়। সেই সুরমা লোকজন চোখে লাগায় যার ফলে চোখ ভাল থাকে (?) এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। সুরমা একটি আলাদা খনিজদ্রব্য। এর সঙ্গে তুর পাহাড়ের কোনো সম্পর্ক নেই।
💂পরিরাজ: কোরআনে বা তাফসিরে কোথাও মুসা (আঃ)-এর আল্লাহকে দর্শনের ঘটনার সঙ্গে সুরমাকে জড়িয়ে দেওয়ার কথাটির সামান্যতমও উল্লেখ নেই।
👩জেমি : আচ্ছা এ তূর পর্বতকে মুসার পর্বত বলা হয় কেন ?
💂পরিরাজ : কেননা এই তুর পাহাড়েই হযরত মুসা (আঃ) কে বাইবেলে বর্ণিত দশটি বিধান দেওয়া হয়। সেই কারণে এই পাহাড়কে মুসার পাহাড়ও বলা হয়।
💂পরিরাজ: তুর পাহাড়ের কাছাকাছি কয়েকটি পাহাড় আছে পাহাড়ের নাম ‘সানত কার্তিন’। এই পাহাড়টি দক্ষিণ সিনাই মহাফাজায় অবস্থিত এবং মিসরের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়। এই পাহাড়টি মূসা (আঃ) পাহাড়ের সাথে একেবারে লাগানো। খ্রিস্টানরা এটাকে মহা পবিত্র স্থান মনে করে।
তাই পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে খ্রিস্টান পর্যটকরা এই পাহাড় যিয়ারত করতে ছুটে আসে। পাহাড়টি মূলত খ্রিস্টান সন্ন্যাসীদের আবাসস্থল ছিল। বড় বড় ধর্মযাজকরা এখানে এসে বসবাস করত। যার ফলে খ্রিস্টানদের কাছে এটার গুরুত্ব অনেক বেশি। এর উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৬০০ মিটার। এই পাহাড়টি দেখতে অনেক সুন্দর। সোনালি রংয়ের।
💂পরিরাজ: সিনাই পর্বতের কথা পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন;
[৩২] “আর আমি যখন তোমাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম এবং তুর পর্বতকে তোমাদের মাথার উপর তুলে ধরেছিলাম এই বলে যে, তোমাদিগকে যে কিতাব দেয়া হয়েছে তাকে ধর সুদৃঢ়ভাবে এবং এতে যা কিছু রয়েছে তা মনে রেখো যাতে তোমরা ভয় কর।”
💂পরিরাজ: অন্য এক আয়াতে এসেছে, শপথ ডুমুর, যয়তুন ও সিনাই প্রান্তরস্থ তূর পর্বতের এবং এই নিরাপদ নগরীর। এভাবেই মহান আল্লাহ্ তায়ালা পবিত্র কোরআনের সূরা আত-ত্বীনে তূর পর্বতের শপথ করেছেন।
💂পরিরাজ: তুর পাহাড়ের পবিত্র জুলন্ত ঝোপ গাছ (বার্নিং বুশ)! সিনাই পর্বতের পাদদেশে রয়েছে এক পবিত্র গাছ, যার নাম জ্বলন্ত ঝোপ বা বার্নিং বুশ। সিনাই পর্বতের স্তল ভুমি থেকে কিছুটা উপরে একটি গির্জার সামনে পাথর দিয়ে গোলাকারে বাঁধানো এই গাছটি তিন ধর্মের (ইহুদি, খৃষ্টান ও মুসলমান) মানুষের কাছেই পবিত্র। হাজার হাজার বছরের পুরানো এই গাছটি দেখতে অনেকটা আমাদের দেশের লতা জাতীয় গাছের মত। এই গাছটির কথা পবিত্র কোরআন শরিফেও উল্লেখ রয়েছে।
💂পরিরাজ: গাছের দেওয়ালে লিখা রয়েছে পাতা ছেরা নিষেধ, কিন্তু কে শুনে কার কথা? পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আশা পর্যটকরা হাতের নাগালে পাওয়া সব পাতাই তুলে নিচ্ছেন। অনেকে তাদের মনোবাসনা কাগজে লিখে ছুরে ফেলছেন গাছের দেওয়ালের ভিতর।
💂পরিরাজ: তুর পাহাড় মিসরের দক্ষিণ সাইনা জেলায় অবস্থিত। সাইনার মূল শহরের নাম ‘আত তুর’। বড় শহরের নাম- শারমুশ শাইখ। পাহাড়টির উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২২৮৫ মিটার। এই পাহাড়কে জাবালে মুসা নামে নামকরণ করা হয়েছে। এই পাহাড়ের পাদদেশে হজরত মুসা (আঃ)-এর ভাই হজরত হারুন (আঃ)-এর কবর রয়েছে।
👩জেমি: এরপর আমাকে প্রসিদ্ধ সুয়েজ ক্যানেল দেখিয়ে বলছে;
পরিরাজ: এটাই সেই প্রসিদ্ধ সুড়ঙ্গ পথ। এই সুড়ঙ্গ পথটির নামকরণ করা হয়েছে শহীদ আহমদ হামদীর নামে। এই ব্যক্তি মিসরের তৎকালীন সেনাবাহিনীর একজন কর্ণেল ছিলেন। ১৯৭৩ সালে মিসর ও ইসরাঈলের সাথে যে যুদ্ধ হয়েছিল, তাতে তিনি শহীদ হন। যুদ্ধে শহীদ আহমাদ হামদীর বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার স্মৃতি স্বরূপ তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদাত এর নামকরণ করেন শহীদ আহমাদ হামদী ক্যানেল। আফ্রিকা ও এশিয়া সংযোগ স্থাপনকারী এই সুড়ঙ্গটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ইসরাঈলের সাথে শান্তি প্রক্রিয়া চালু হলে ।
💂পরিরাজ: এটা সুয়েজ খালের তলদেশ দিয়ে অতিক্রমের দ্বিতীয় পথ। কায়রো থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই সুড়ঙ্গ পথটি সাইনা উপদ্বীপের সাথে সুয়েজ শহরসহ মিসরের বাকি অংশের সাথে সংযোগ সৃষ্টি করেছে।
💂পরিরাজ: প্রতিদিন প্রায় বিশ হাজারেরও অধিক গাড়ি পার হয় এই সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে। এটা নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য হল পর্যটন বিকাশ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। নির্মাণে ইউরোপীয় দেশগুলো অংশ নেয়। একটি বৃটিশ কোম্পানীর পরিকল্পনা মোতাবেক আরব ঠিকাদার কোম্পানি এর নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করে। সুড়ঙ্গ পথটি চালু করার পর ফাটল দেখা দিলে জাপানের এক কোম্পানীর মাধ্যমে তা মেরামত করা হয়। সুড়ঙ্গ পথটি লম্বায় ৫৯১২ মিটার।
💂পরিরাজ: পশ্চিমের অনুপ্রবেশদ্বার থেকে ১৯৮৪ মিটার, মাঝখানে ১৬৪০ মিটার। এই সুড়ঙ্গটা অনেক সুন্দর। এটা দেখার জন্য অনেক পর্যটক আসে।
👩জেমি : তারপর একটি শহর দেখিয়ে বলছে; এটা শারমুশ শাইখ শহর!
পরিরাজ: এই শহরটা পৃথিবীর চতুর্থতম সুন্দর শহর হিসাবে গণ্য। খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। এখানে বাহরুল আহমার নামক সমুদ্র সৈকত(সী বিচ) আছে। অনেক পর্যটক এখানে ঘুরতে আসে। অবসর সময় যাপন করে।
💂পরিরাজ: এই সেই সমুদ্র যাতে মহান আল্লাহ তাআলা তার দুশমনকে চুবিয়ে মেরেছেন এবং তার প্রিয় বান্দাদের বাঁচিয়েছেন। কুরআনে তা বর্ণিত হয়েছে এভাবে- আমি মূসা ও তার সাথে যারা ছিল সকলকে রক্ষা করেছি। অতপর অন্যদের ডুবিয়ে মেরেছি।
💂পরিরাজ: আসলে আল্লাহর কুদরতের সামনে দুনিয়ার সব শক্তিই তুচ্ছ। তারপরও মানুষ এই নিদর্শন থেকে কেন শিক্ষা গ্রহণ করে না? কোথায় সেই দাম্ভিক ফেরাউন ও তার বিশাল সৈন্য বাহিনী? আল্লাহর এক ইশারাতেই মুহূর্তের মধ্যে তাদের সলিল সমাধি হয়েছে। এই সেই সমুদ্র, যুগ যুগ ধরে সেই সত্যের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
💂পরিরাজ: সাইনা অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি জেলা এবং এই এলাকার নাম কুরআন মাজীদে উল্লেখ হয়েছে। এই পাহাড়ি এলাকায় এক প্রকার গাছ হয় যা থেকে তেল তৈরি হয়। সাইনা নবীদের বরকতময় ভূমি। এই এলাকায় অনেক নবী রাসূলের আগমন ঘটেছে। এখানে রয়েছে সেই ঐতিহাসিক ‘জাবালে মূসা’,অনেক নবীদের কবর, বনী ইসরাঈলের তীহ নামক ময়দান। আরো অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে এই মাটি ও পাহাড় সম্পৃক্ত। সুতরাং এই ভূমির বরকত ও নিয়ামত কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
💂পরিরাজ: এলাকাটি মিসরবাসী ও মিসর সরকারের কাছে বরং পুরো মুসলিম উম্মাহর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা। ইসরাঈল সবসময় এটা দখল করতে চায়, যে কোনো মূল্যে। যার ফলে অনেক সময় হামলা করে বসে এবং বিভিন্ন গ্রুপ ও এই এলাকাটা দখল করার জন্য বিভিন্ন সময় সেনাবাহিনীর উপর হামলা করে থাকে। অনেক সেনাও এতে হতাহত হয়।
💂পরিরাজ: যুগ যুগ ধরে সাইনার ভৌগলিক অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটা এশিয়া মহাদেশ ও আফ্রিকা মহাদেশের একমাত্র স্থলভাগ যেখানে দুটি মহাদেশ পাশাপাশি মিলিত হয়েছে।
💂পরিরাজ: প্রাচীন কাল থেকেই মিশর ও গোটা আফ্রিকার মানুষ হিজায, প্রাচীন রোম ও পারস্যের সাথে স্থল যোগাযোগের জন্য সাইনা উপত্যকা ব্যবহার করত। আকাশ ও সমুদ্রপথে যোগাযোগ সহজ হওয়ার আগে এই সাইনাই ছিল গোটা আফ্রিকা ও এশিয়ার বাণিজ্যিক, কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আদান প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ পথ।
💂পরিরাজ: ৬৪০ খ্রিস্টাব্দে আমর বিন আছ রা.-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীও এই সাইনা হয়েই মিশরে আসে এবং ওখানেই বাইজেন্টাইনদের প্রতিরোধের মোকাবেলা করে। দ্বাদশ শতকের ক্রুসেড বাহিনীর সাথেও মিসরের আইয়ুবিদের সাথে অনেক যুদ্ধ হয় এই সাইনাতে।
💂পরিরাজ: ১১৮৭ সালে যে ঐতিহাসিক হিট্টিনের যুদ্ধে সালাহউদ্দিন আইয়ুবির নেতৃত্বে মুসলিমবাহিনী কর্তৃক ক্রুসেডারদের পরাজয় ঘটে, সে হিট্টিনও ঐতিহাসিক সাইনার অংশ, যা বর্তমানে ফিলিস্তিনের অংশ। ত্রয়োদশ শতকের মাঝামাঝি ১২৬০ ঈ. মিসরের মামলুকি আমলে তাতারিদের সাথে যে ঐতিহাসিক আইন জালুত যুদ্ধ হয় তাও এই সাইনাতে।
💂পরিরাজ: এভাবে সব যুগের সাম্রারাজ্যবাদীদের লোলুপ দৃষ্টি থাকত এই সাইনার দিকে। এখানে অধিকার বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে অনেক যুদ্ধ হয়েছে। আধুনিককালের অন্যতম যুদ্ধ হল মিসর-ইসরাঈল যুদ্ধ। ১৯৬৭ সালে সুয়েজখাল পর্যন্ত গোটা সাইনা অঞ্চল মিশর থেকে ইইসরাঈল ছিনিয়ে নিয়েছিল। পরে ১৯৭৩ সালের ৬ অক্টোবর এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে মিশর তা পুনরুদ্ধার করে।
💂পরিরাজ: আর আধুনিককালে সাইনা উপদ্বীপের বুক চিরে সুয়েজখাল খনন করে ভুমধ্যসাগর ও লোহিত সাগরের মাঝে সংযোগ ঘটানোর ফলে আন্তর্জাতিক সমুদ্র যোগাযোগে যে গতি এসেছে তাও ভৌগোলিক দিক থেকে সাইনার গুরুত্ব অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই সাইনা হলো ইসলাম ও প্রাগ-ইসলামিক যুগ থেকেই মিশর ও আফ্রিকার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল।
👩জেমি: ওয়াও! তুর পাহাড়! কী মধুর অনুভূতি!
👩জেমি: পাথরের পাহাড়ে রয়েছে বিভিন্ন রংয়ের মেলা। বড় বড় পাথর কী চমৎকার সাজে সজ্জিত। সত্যিই মহান আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি কত সুন্দর!
💂পরিরাজ : আসলে আল্লাহর কুদরত নিয়ে আমাদের তেমন ভাবা হয় না। যার ফলে আমাদের মাঝে ঈমানের দুর্বলতা সৃষ্টি হয়। এজন্যই তো মহান আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি সর্ম্পকে বলেছেন,তোমরা পাহাড়ের দিকে দেখ;
💂পরিরাজ: হযরত মূসা (আঃ) যখন মাদায়েন থেকে মিশরে স্বস্ত্রীক ফিরছিলেন, তখন একটি গাছের মধ্যে আগুন দেখতে পেলেন। অত:পর তিনি সেই গাছের কাছে গেলেন এমন সময় তূর পাহাড়ের পাদদেশে একটি বৃক্ষ থেকে হঠাৎ আওয়াজ আসছে, যিনি কথা বলছেন তিনি তার দৃষ্টির আড়ালেই থাকলেন, তিনি ছিলেন আল্লাহ !
👩জেমি: আল্লাহ তখন মূসাকে কী বলেছেন ;
💂পরিরাজ: কুরআনে মূসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে অনেক আলোচনা করা হয়েছে। অনেক উপমা ও বিভিন্ন আঙ্গিকে তাঁর ঘটনা বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। যাতে মানুষ এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
আল্লাহ বললেন; [৩৩] “হে মূসা! নিশ্চয় আমি তোমার পালনকর্তা, অতএব তুমি জুতা খুলে ফেল, তুমি পবিত্র উপতক্যা “তূআ’য় রয়েছ। এবং আমি তোমাকে নির্বাচন করেছি, অতএব যা প্রত্যাদেশ করা হচ্ছে তা শুনতে থাক”
💂পরিরাজ: অতঃপর, আল্লাহ এবং মূসার মধ্যে কথোপকথন শুরু হয় ; আল্লাহ বলেন, হে মূসা! আমিই আল্লাহ, আমি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই, কাজেই তুমি আমার ইবাদত করো এবং আমাকে স্মরণ করার জন্য নামায কায়েম করো। কিয়ামত অবশ্যই আসবে, আমি তার সময়টা গোপন রাখতে চাই, যাতে প্রত্যেকটি প্রাণসত্তা তার প্রচেষ্টা অনুযায়ী প্রতিদান লাভ করতে পারে।
কাজেই যে ব্যক্তি তার প্রতি ঈমান আনে না এবং নিজের প্রবৃত্তির দাস হয়ে গেছে সে যেন তোমাকে সে সময়ের চিন্তা থেকে নিবৃত্ত না করে। অন্যথায় তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে।
আর হে মূসা! এ তোমার হাতে এটা কি?” মূসা জবাব দিল, “এ আমার লাঠি। এর ওপর ভর দিয়ে আমি চলি, নিজের ছাগলগুলোর জন্য এর সাহায্যে পাতা পাড়ি এবং এর সাহায্যে আরো অনেক কাজ করি।” বললেন, “একে ছুঁড়ে দাও হে মূসা”!
সে ছুঁড়ে দিল এবং অকস্মাৎ সেটা হয়ে গেলো একটা সাপ, যা দৌড়াচ্ছিল। বললেন, “ধরে ফেলো ওটা এবং ভয় করো না, আমি ওকে আবার ঠিক তেমনটিই করে দেবো যেমনটি সে আগে ছিল। আর তোমার হাতটি একটু বগলের মধ্যে রাখো, তা কোন প্রকার ক্লেশ ছাড়াই উজ্জ্বল হয়ে বের হয়ে আসবে, এটা দ্বিতীয় নিদর্শন।
এজন্য যে, আমি তোমাকে নিজের বৃহৎ নিদর্শনগুলো দেখাবো। এখন তুমি যাও ফেরাউনের কাছে, সে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে।” মূসা বললো, “হে আমার রব! আমার বুক প্রশস্ত করে দাও। এবং আমার কাজ আমার জন্য সহজ করে দাও এবং আমার জিভের জড়তা দূর করে দাও, যাতে লোকেরা আমার কথা বুঝতে পারে।
💂পরিরাজ : [৩৪] বাইবেলে এর যে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে তা হচ্ছে এই যে, হযরত মূসা বললেনঃ “হায় সদাপ্রভু! আমি বাকপটু নহি, ইহার পূর্বও ছিলাম না, বা এই দাসের সহিত তোমার আলাপ করিবার পরেও নহি। কারণ আমি জড় মুখ ও জড় জিহ্বা।
কিন্তু তালমূদে এ সম্পর্কিত একটি দীর্ঘ কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। তাতে একথা বলা হয়েছে যে, শৈশবে হযরত মূসা যখন ফেরাউনের গৃহে লালিত পালিত হচ্ছিলেন তখন একদিন তিনি ফেরাউনের মাথার মুকুট নামিয়ে নিজের মাথায় পরে নেন। এতে প্রশ্ন দেখা দেয় যে, এ শিশু এ কাজটি ইচ্ছাকৃতভাবে করেছে, অথবা এটা তার নিছক বালকসুলভ চপলতা। শেষে ঠিক করা হয়, শিশুর সামনে সোনা ও আগুন একসাথে রাখা হবে। সে মোতাবেক দু’টি জিনিস এনে একসাথে সামনে রাখা হলো এবং হযরত মূসা আগুন উঠিয়ে মুখে পুরে দিলেন। এতে তিনি কোন রকমে প্রাণে বেঁচে গেলেও তার জিহ্বায় চিরদিনের জন্য জড়তা সৃষ্টি হয়।
💂পরিরাজ : এ কাহিনী ইসরাঈলী বর্ণনা থেকে স্থানান্তরিত হয়ে আমাদের তাফসীর প্রন্থগুলোতেও লিখিত হয়েছে। কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তি এ কথা মেনে নিতে অস্বীকার করে। কারণ শিশু যদি আগুনে হাত দিয়েও ফেলে তাহলে এটা কোনক্রমেই সম্ভব নয় যে, সে অঙ্গার উঠিয়ে নিয়ে মুখের মধ্যে পুরে দেবে। শিশু তো আগুনের জ্বালা অনুভব করার সাথে সাথেই হাত গুটিয়ে নেবে। পোড়া হাতে অঙ্গার নিয়ে সে অংগার মুখে দেবার সাহস পাবে কেমন করে?
কুরআনের শব্দাবলী থেকে আমরা যে কথা বুঝতে পারি তা হচ্ছে এই যে, হযরত মূসা আলাইহিস সালাম নিজের মধ্যে বাগ্মীতার অভাব দেখছিলেন। ফলে তাঁর মনেআশঙ্কা জেগেছিল যে, নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি তাঁর কখনো বক্তৃতা দেবার প্রয়োজন দেখা দেয় (এ পর্যন্ত যার কোন প্রয়োজন তাঁর দেখা দেয়নি) তাহলে তাঁর স্বভাবসুলভ সংকোচ বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তাই তিনি দোয়া করেন, হে আল্লাহ। আমার জিভের জড়তা দূর করে দাও যাতে আমি নিজের কথা লোকদেরকে ভালোভাবে বুঝাতে পারি। [৩৫] এ বিষয়েই ফেরাউন একবার তাঁকে খোঁটা দিয়ে বলেছিলঃ “এ ব্যক্তি তো নিজের কথাই সঠিকভাবে বলতে পারে না।”
💂পরিরাজ: অর্থাৎ যার কাছে না আছে অর্থ-সম্পদ না আছে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব।
কোন কোন মুফাসসিরের ধারণা, বাল্যকাল থেকেই হযরত মূসার (আঃ) কথায় যে তোতলামি ছিল সে বিষয়েই ফেরাউনের এই আপত্তি। কিন্তু এ ধারণা ঠিক নয়।
সূরা তোহাতে একথা বলা হয়েছে যে, হয়রত মূসা(আঃ)কে যে সময় নবুওয়াতের পদ-মর্যদার ভূষিত করা হচ্ছিলো তখন তিনি আল্লাহর কাছে এই বলে প্রার্থনা করেছিলেন যে আমার কথার জড়তা দূর করে দিন যাতে মানুষ ভালভাবে আমার কথা বুঝতে পারে। সেই সময়ই তাঁর অন্যান্য প্রার্থনার সাথে এই প্রার্থনাও মঞ্জুর করা হয়েছিলো। তাছাড়া কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে হযরত মূসার (আঃ) যেসব বক্তৃতা উদ্ধৃত করা হয়েছে তা তাঁর পূর্ণ মাত্রার সাবলীল ভাষার প্রতি ইঙ্গিত করে।
💂পরিরাজ: অতএব, ফেরাউনের আপত্তির কারণ তাঁর কথার তোতলামি ছিল না। বরং তার আপত্তির বিষয় ছিল এই যে, এ ব্যক্তি অজানা কি সব এলোমেলো কথাবার্তা বলে যার উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায় কখনো আমাদের বোধগম্য হয়নি।
💂পরিরাজ: এ দুর্বলতা অনুভব করেই হযরত মূসা নিজের ভাই হারুনকে সাহায্যকারী হিসেবে চান। মূসা বলেন, [৩৬] “আমার ভাই হারুন আমার চেয়ে বাকপটু তাকে সাহায্যকারী হিসেবে আমার সাথে পাঠিয়ে দাও।”
💂পরিরাজ: পরবর্তী আলোচনায় আরো জানা যায় যে, হযরত মূসার এ দুর্বলতা দূর হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি বেশ জোরদার ভাষণ দিতে শুরু করেছিলেন। কুরআনে ও বাইবেলে তাঁর পরবর্তীকালের যেসব ভাষণ উদ্ধৃত হয়েছে তা উন্নত পর্যায়ের শাব্দিক অলংকার ও বাকপটুতার সাক্ষ্য দেয়।
💂পরিরাজ: জিভে জড়তা আছে এমন একজন তোতলা ব্যক্তিকে আল্লাহ নিজের রসূল নিযুক্ত করবেন, একথা স্বাভাবিক বিচার বুদ্ধি বিরোধী। রসূলরা সব সময় এমন ধরনের লোক হয়েছেন যারা চেহারা, সুরত ব্যক্তিত্ব ও যোগ্যতার দিক দিয়ে হয়েছেন সর্বোত্তম, যাদের ভেতর বাইরের প্রতিটি দিক অন্তর ও দৃষ্টিকে প্রভাবিত করেছে। কোন রসূলকে এমন কোন দোষ সহকারে পাঠানো হয়নি এবং পাঠানো যেতে পারতো না যে কারণে তিনি লোকদের মধ্যে হাস্যাস্পদ হন অথবা লোকেরা তাকে হেয় প্রতিপন্ন করে।
আর আমার জন্য নিজের পরিবার থেকে সাহায্যকারী হিসেবে নিযুক্ত করে দাও! আমার ভাই হারুনকে।
💂পরিরাজ: বাইবেলের বর্ণনা অনুসারে [৩৭] হযরত হারুন হযরত মূসার চাইতে তিন বছরের বড় ছিলেন।
মূসা বললেন, তার মাধ্যমে আমার হাত মজবুত করো। এবং তাকে আমার কাজে শরীক করে দাও, যাতে আমরা খুব বেশী করে তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করতে পারি, এবং খুব বেশী করে তোমার চর্চা করি। তুমি সব সময় আমাদের অবস্থার পর্যবেক্ষক।” বললেন, “হে মূসা! তুমি যা চেয়েছো তা তোমাকে দেয়া হলো। আমি আর একবার তোমার প্রতি অনুগ্রহ করলাম।
💂পরিরাজ: এরপর আল্লাহ হযরত মূসাকে তাঁর জন্ম থেকে নিয়ে এ পর্যন্ত তার প্রতি যতগুলো অনুগ্রহ করা হয়েছিল, এক এক করে তার সবক’টি তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেন। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে হযরত মূসাকে এ অনুভূতি দান করা যে, এখন যে কাজে তোমাকে নিযুক্ত করা হচ্ছে এ কাজের জন্যই তোমাকে পয়দা করা হয়েছে এবং এ কাজের জন্যই আজ পর্যন্ত বিশেষ সরকারী তত্ত্বাবধানে তুমি প্রতিপালিত হয়ে এসেছো।
💂পরিরাজ: আল্লাহ মূসাকে বললেন, সে সময়ের কথা মনে করো যখন আমি তোমার মাকে ইশারা করেছিলাম, এমন ইশারা যা অহীর মাধ্যমে করা হয়, এই মর্মে যে, এ শিশুকে সিন্দুকের মধ্যে রেখে দাও এবং সিন্দুকটি দরিয়ায় ভাসিয়ে দাও, দরিয়া তাকে তীরে নিক্ষেপ করবে এবং আমার শত্রু ও এ শিশুর শত্রু একে তুলে নেবে। আমি নিজের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি ভালোবাসা সঞ্চার করেছিলাম এবং এমন ব্যবস্থা করেছিলাম যাতে তুমি আমার তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হও।
স্মরণ করো, যখন তোমার বোন চলছিল, তারপর গিয়ে বললো, “আমি কি তোমাদের তার সন্ধান দেবো, যে এ শিশুকে ভালোভাবে লালন করবে?” এভাবে আমি তোমাকে আবার তোমার মায়ের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়েছি, যাতে তার চোখ শীতল থাকে এবং সে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত না হয়। এবং (এটাও স্মরণ করো) তুমি একজনকে হত্যা করে ফেলেছিলে, আমি তোমাকে এ ফাঁদ থেকে বের করেছি এবং তোমাকে বিভিন্ন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে নিয়ে এসেছি, আর তুমি মাদইয়ানবাসীদের মধ্যে কয়েক বছর অবস্থান করেছিলে। তারপর এখন তুমি ঠিক সময়েই এসে গেছো। হে মূসা! আমি তোমাকে নিজের জন্য তৈরী করে নিয়েছি।
যাও, তুমি ও তোমার ভাই আমার নিদর্শনগুলোসহ এবং দেখো আমার স্মরণে ভুল করো না। যাও, তোমরা দু’জন ফেরাউনের কাছে, সে বিদ্রোহী হয়ে গেছে। তার সাথে কোমলভাবে কথা বলো, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভীত হবে।” উভয়েই বললো, “হে আমাদের রব! আমাদের ভয় হয়, সে আমাদের সাথে বাড়াবাড়ি করবে অথবা আমাদের ওপর চড়াও হবে।”
💂পরিরাজ: এটা এমন সময়ের কথা হতে পারে যখন হযরত মূসা (আঃ) মিসরে পৌঁছে গিয়েছিলেন এবং হযরত হারুন কার্যত তাঁর সাথে শরীক হয়ে গিয়েছিলেন। সে সময় ফেরাউনের কাছে যাওয়ার আগে উভয়েই আল্লাহর কাছে এ নিবেদন পেশ করে থাকবেন।
আল্লাহ বললেন, “ভয় করো না, আমি তোমাদের সাথে আছি, সবকিছু শুনছি ও দেখছি।
যাও তার কাছে এবং বলো, আমরা তোমার রবের প্রেরিত, বনী ইসরাঈলকে আমাদের সাথে যাওয়ার জন্য ছেড়ে দাও এবং তাদেরকে কষ্ট দিয়ো না। আমরা তোমার কাছে নিয়ে এসেছি তোমার রবের নিদর্শন এবং শান্তি তার জন্য যে সঠিক পথ অনুসরণ করে। আমাদের অহীর সাহায্যে জানানো হয়েছে যে, শাস্তি তার জন্য যে মিথ্যা আরোপ করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়।”
💂পরিরাজ: এ ঘটনাটি বাইবেল ও তালমূদে যেভাবে পেশ করা হয়েছে তার ওপরও একবার নজর বুলানো দরকার। এর ফলে কুরআন মজীদ আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের কথা কেমন মর্যাদা সহকারে বর্ণনা করেছে এবং বনী ইসরাঈলের বর্ণনসমূহে এর কি চিত্র অংকন করা হয়েছে তা আন্দাজ করা যাবে। [৩৮] বাইবেলের বর্ণনা হচ্ছে, প্রথমবার আল্লাহ যখন মূসাকে বললেন, “এখন আমি তোমাকে ফেরাউনের কাছে পাঠাচ্ছি এ উদ্দেশ্যে যে, তুমি আমার জাতি বনী ইসরাঈলকে মিসর থেকে বের করে আনবে” তখন হযরত মূসা জবাব দিলেন, “ফেরাউনের কাছে যাবার এবং বনী ইসরাঈলকে মিসর থেকে বের করে আনার আমি কে? ” তারপর আল্লাহ হযরত মূসাকে অনেক বুঝালেন, তাঁর মনে শক্তি সঞ্চার করলেন, মুজিযা দান করলেন কিন্তু মূসা আবার এ কথাই বললেন, “হে আমার প্রভু বিনয় করি, অন্য যাহার হাতে পাঠাইতে চাও এ বার্তা পাঠাও।”
💂পরিরাজ: তালমূদের বর্ণনা আবার এর চাইতে কয়েক কদম এগিয়ে গেছে। সেখানে বলা হয়েছেঃ এ ব্যাপারটি নিয়ে আল্লাহ ও হযরত মূসার সাথে সাতদিন পর্যন্ত বাদানুবাদ হতে থাকে। আল্লাহ বলতে থাকেন, নবী হও। কিন্তু মূসা বলতে থাকেন, আমার কণ্ঠই খুলছে না, কাজেই আমি নবী হই কেমন করে। শেষে আল্লাহ বললেন, তুমি নবী হয়ে যাও এতেই আমি খুশী। একথায় হযরত মূসা বলেন, লূতকে বাঁচাবার জন্য আপনি ফেরেশতা পাঠিয়েছিলেন,
হাজেরা যখন সারার গৃহ থেকে বের হলেন তখন তার জন্য পাঁচজন ফেরেশতা পাঠিয়েছিলেন, আর এখন নিজের বিশেষ সন্তান (বনী ইসরাঈল)-দেরকে মিসর থেকে বেরকরে আনার জন্য আপনি আমাকে পাঠাচ্ছেন? একথায় আল্লাহ অসন্তুষ্ট হলেন এবং তিনি রিসালাতের কাজে তাঁর সাথে হারুনকে শরীক করে দিলেন। আর মূসার সন্তানদের বঞ্চিত করে পৌরোহিত্যের দায়িত্ব সন্তানদের দিয়ে দিলেন-এগুলোই হচ্ছে প্রাচীন কিতাব এবং নির্লজ্জ লোকেরা এগুলো সম্পর্কে বলে থাকে যে, কুরআনের এ কাহিনীগুলো নাকি এসব কিতাব থেকে নকল করা হয়েছে।
💂পরিরাজ: এ কুরআনে যেসব কথা বলা হচ্ছে এগুলো কোন উড়ো কথা নয়। এগুলো কোন মানুষের আন্দাজ অনুমান ও মতামত ভিত্তিকও নয়। বরং এক জ্ঞানবান প্রাজ্ঞ সত্তা এগুলো নাযিল করছেন। তিনি নিজের সৃষ্টির প্রয়োজন ও কল্যাণ এবং তার অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত সম্পর্কে পুরোপুরি জানেন। বান্দাদের সংশোধন ও পথনির্দেশনার জন্য তাঁর জ্ঞান সর্বোত্তম কৌশল ও ব্যবস্থা অবলম্বন করে।
💂পরিরাজ: পবিত্র কোরআনে আরও বলা হয়েছে, [৩৯] (তাদেরকে সেই সময়ের কথা শুনাও) যখন মূসা তাঁর পরিবারবর্গকে বললো “আমি আগুনের মতো একটা বস্তু দেখেছি। এখনি আমি সেখান থেকে কোন খবর আনবো অথবা খুঁজে আনবো কোন অংগার, যাতে তোমরা উষ্ণতা লাভ করতে পারো।”
💂পরিরাজ: এটা তখনকার ঘটনা যখন হযরত মূসা আলাইহিস সালাম মাদয়ানে আট দশ বছর অবস্থান করার পর নিজের পরিবার-পরিজন নিয়ে কোন বাসস্থানের সন্ধানে বের হয়েছিলেন। মাদয়ান এলাকাটি ছিল আকাবা উপসাগরের তীরে আরব ও সিনাই উপদ্বীপের উপকূলে, সেখান থেকে যাত্রা করে হযরত মূসা সিনাই উপদ্বীপের দক্ষিণ অংশে পৌঁছেন। এ অংশের যে স্থানটিতে তিনি পৌঁছেন বর্তমানে তাকে সিনাই পাহাড় ও মূসা পর্বত বলা হয়। কুরআন নাযিলের সময় এটি তুর নামে পরিচিত ছিল। এখানে যে ঘটনাটির কথা বলা হয়েছে সেটি এরই পাদদেশে সংঘটিত হয়েছিল।
💂পরিরাজ: আলোচনার প্রেক্ষাপট থেকে মনে হয় যে, এটা ছিল শীতকালের একটি রাত। হযরত মূসা একটি অপরিচিত এলাকা অতিক্রম করছিলেন। এ এলাকার ব্যাপারে তাঁর বিশেষ জানা-শোনা ছিল না। তাই তিনি নিজের পরিবারের লোকদের বললেন, আমি সামনের দিকে গিয়ে একটু জেনে আসি আগুন জ্বলছে কোন জনপদে, সামনের দিকে পথ কোথায় কোথায় গিয়েছে এবং কাছাকাছি কোন কোন জনপদ আছে। তবুও যদি দেখা যায়, ওরাও আমাদের মত চলমান মুসাফির যাদের কাছ থেকে কোন তথ্য সংগ্রহ করা যাবে না, তাহলেও অন্ততপক্ষে ওদের কাছ থেকে একটু অংগার তো আনা যাবে। এ থেকে আগুন জ্বালিয়ে তোমরা উত্তাপ লাভ করতে পারবে।
💂পরিরাজ: হযরত মূসা (আঃ) যেখানে কুঞ্জবনের মধ্যে আগুন লেগেছে বলে দেখেছিলেন সে স্থানটি তূর পাহাড়ের পাদদেশে সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার ফুট ওপরে অবস্থিত। রোমান সাম্রাজ্যের প্রথম খৃস্টান বাদশাহ কনষ্টানটাইন ৩৬৫ খৃস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে ঠিক যে জায়গায় এ ঘটনাটি ঘটেছিল সেখানে একটি গীর্জা নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। এর দু’শো বছর পরে সম্রাট জাষ্টিনিয়ান এখানে একটি আশ্রম (Monasterery) নির্মাণ করেন। কনষ্টান্টাইনের গীর্জাকেও এর অর্ন্তভূক্ত করা হয়। এ আশ্রম ও গীর্জা আজও অক্ষুন্ন রয়েছে। এটি গ্রীক খৃস্টীয় গীর্জার (Greek Orthodox Church) পাদরী সমাজের দখলে রয়েছে।
💂পরিরাজ: সেখানে পৌঁছবার পর আওয়াজ এলো “ধন্য সেই সত্তা যে এ আগুনের মধ্যে এবং এর চারপাশে রয়েছে, পাক-পবিত্র আল্লাহ সকল বিশ্ববাসীর প্রতিপালক।
💂পরিরাজ: সূরা কাসাসে বলা হয়েছে, আওয়াজ আসছিল একটি বৃক্ষ থেকে এ থেকে ঘটনাটির যে দৃশ্য সামনে ভেসে ওঠে তা হচ্ছে এই যে, উপত্যাকা এক কিনারে আগুনের মতো লেগে গিয়েছিল কিন্তু কিছু জ্বলছিল না এবং ধোঁয়াও উড়ছিল না। আর এ আগুনের মধ্যে একটি সবুজ শ্যামল গাছ দাঁড়িয়েছিল। সেখান থেকে সহসা এ আওয়াজ আসতে থাকে।
💂পরিরাজ: আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের সাথে এ ধরণের অদ্ভূত ব্যাপার ঘটা চিরাচরিত ব্যাপার। নবী (সাঃ) যখন প্রথম বার নবুওয়াতের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন তখন হেরা গিরিগূহায় একান্ত নির্জনে সহসা একজন ফেরেশতা আসেন।
💂পরিরাজ: তিনি তাঁর কাছে আল্লাহর পয়গাম পৌঁছাতে থাকেন। হযরত মূসার ব্যাপারেও একই ঘটনা ঘটে। এক ব্যক্তি সফর কালে এক জায়গায় অবস্থান করছেন। দূর থেকে আগুন দেখে পথের সন্ধান নিতে বা আগুন সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে আসেন। অকস্মাৎ সকল প্রকার আন্দাজ অনুমানের ঊর্ধ্বে অবস্থানকারী স্বয়ং আল্লাহ তাঁকে সম্বোধন করেন। এসব সময় আসলে এমন একটি অস্বাভাবিক অবস্থা বাইরেও এবং নবীগণের মনের মধ্যেও বিরাজমান থাকে যার ভিত্তিতে তাঁদের মনে এরূপ প্রত্যয় জন্মে যে, এটা কোন জিন বা শয়তানের কারসাজী অথবা তাদের নিজেদের কোন মানসিক ভাবান্তর নয় কিংবা তাঁদের ইন্দ্রিয়ানুভূতিও কোন প্রকার প্রতারিত হচ্ছে না বরং প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব-জাহানের মালিক ও প্রভু অথবা তাঁর ফেরেশতাই তাঁদের সাথে কথা বলা হয়েছে।
💂পরিরাজ: এ অবস্থায় “পাক-পবিত্র আল্লাহ” বলার মাধ্যমে আসলে হযরত মূসাকে এ ব্যাপারে সতর্ক করা হচ্ছে যে, বিভ্রান্ত চিন্তা ও বিশ্বাস থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়েই এ ঘটনাটি ঘটছে। অর্থাৎ এমন নয় যে, আল্লাহ রব্বুল আলামীন এ গাছের ওপর বসে আছেন অথবা এর মধ্যে অনুপ্রবেশ করে এসেছেন কিংবা তাঁর একচ্ছত্র নূর তোমাদের দৃষ্টিসীমায় বাঁধা পড়েছে বা কারো মুখে প্রবিষ্ট কোন জিহ্বা নড়াচড়া করে এখানে কথা বলছে। বরং এ সমস্ত সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত ও পরিচ্ছন্ন থেকে সেই সত্তা নিজেই তোমার সাথে কথা বলছেন।
💂পরিরাজ: আল্লাহ বললেন; হে মূসা, এ আর কিছু নয়, স্বয়ং আমি আল্লাহ, পরাক্রমশালী ও জ্ঞানী।
এবং তুমি তোমার লাঠিটি একটু ছুঁড়ে দাও।” যখনই মূসা দেখলো লাঠি সাপের মত মোচড় খাচ্ছে, তখনই পেছন ফিরে ছুটতে লাগলো এবং পেছন দিকে ফিরেও দেখলো না। “হে মূসা! ভয় পেয়ো না, আমার সামনে রসূলরা ভয় পায় না।
💂পরিরাজ: সূরা আ’রাফে ও সূরা শু’আরাতে এজন্য (অজগর) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু এখানে একে জান শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে। “জান” শব্দটি বলা হয় ছোট সাপ অর্থে। এখানে “জান” শব্দ ব্যবহার করার কারণ হচ্ছে এই যে, দৈহিক দিক দিয়ে সাপটি ছিল অজগর কিন্তু তার চলার দ্রুততা ছিল ছোট সাপদের মতো। সূরা তা-হায় (ছুটন্ত সাপ) এর মধ্যেও এ অর্থই বর্ণনা করা হয়েছে।
💂পরিরাজ: অর্থাৎ আমার কাছে রসূলদের ক্ষতি হবার কোন ভয় নেই। রিসালাতের মহান মর্যাদায় অভিসিক্ত করার জন্য যখন আমি কাউকে নিজের কাছে ডেকে আনি তখন আমি নিজেই তার নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়ে থাকি। তাই যে কোন প্রকার অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটলেও রসুলকে নির্ভীক ও নিশ্চিন্ত থাকা উচিত। আমি তার জন্য কোন প্রকার ক্ষতিকারক হবো না।
তবে হ্যাঁ, যদি কেউ ভুল-ত্রুটি করে বসে। তারপর যদি সে দুষ্কৃতির পরে সুকৃতি দিয়ে (নিজের কাজ) পরিবর্তিত করে নেয় তাহলে আমি আল্লাহ ক্ষমাশীল ও করুণাময়।
💂পরিরাজ: আরবী ব্যাকরণের সূত্র অনুসারে এ বাক্যাংশের দু’রকম অর্থ হতে পারে। প্রথম অর্থ হলো, ভয়ের কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ যদি থাকে তাহলে তা হচ্ছে এই যে, রসূল কোন ভুল করেছেন। আর দ্বিতীয় অর্থ হলো, যতক্ষণ কেউ ভুল না করে ততক্ষণ আমার কাছে তার কোন ভয় নেই। অর্থাৎ অপরাধকারীও যদি তওবা করে নিজের নীতি সংশোধন করে নেয় এবং খারাপ কাজের জায়গায় ভাল কাজ করতে থাকে, তাহলে আমার কাছে তার জন্য উপেক্ষা ও ক্ষমা করার দরজা খোলাই আছে। প্রসঙ্গক্রমে একথা বলার উদ্দেশ্য ছিল একদিকে সতর্ক করা এবং অন্যদিকে সুসংবাদ দেয়াও। হযরত মূসা আলাইহিমুস সালাম অজ্ঞতাবশত একজন কিবতীকে হত্যা করে মিসর থেকে বের হয়েছিলেন। এটি ছিল একটি ত্রুটি। এদিকে সূক্ষ্ম ইঙ্গিত করা হয়। এ ত্রুটিটি যখন অনিচ্ছাকৃতভাবে তাঁর দ্বারা সংঘটিত হয়েছিল তখন তিনি পরক্ষণেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন এই বলেঃ “হে আমার রব! আমি নিজের প্রতি জুলুম করেছি। আমাকে মাফ করে দাও।”
💂পরিরাজ: আল্লাহ সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে মাফ করে দিয়েছিলেনঃ [৪০] আল্লাহ তাঁকে মাফ করে দিলেন। এখানে সেই ক্ষমার সুসংবাদ তাঁকে দেয়া হয়। অর্থাৎ এ ভাষণের মর্ম যেন এই দাঁড়ালোঃ হে মূসা! আমার সামনে তোমার ভয় পাওয়ার একটি কারণ তো অবশ্যই ছিল। কারণ তুমি একটি ভুল করেছিলে। কিন্তু তুমি যখন সেই দুষ্কৃতিকে সুকৃতিতে পরিবর্তিত করেছো তখন আমার কাছে তোমার জন্য মাগফিরাত ও রহমত ছাড়া আর কিছুই নেই। এখন আমি তোমাকে কোন শাস্তি দেবার জন্য ডেকে পাঠাইনি বরং বড় বড় মু’জিযা সহকারে তোমাকে এখন আমি একটি মহান দায়িত্ব সম্পাদনে পাঠাবো।
💂পরিরাজ: [৪১] আর তোমার হাতটি একটু তোমার বক্ষস্থলের মধ্যে ঢুকাও তো, তা উজ্জ্বল হয়ে বের হয়ে আসবে কোন প্রকার ক্ষতি ছাড়াই। এ (দু’টি নিদর্শন) ন’টি নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত ফেরাউন ও তার জাতির কাছে (নিয়ে যাবার জন্য) তারা বড়ই বদকার।”
পরিরাজ: সূরা বনী ইসরাঈলে বলা হয়েছে মূসাকে আমি সুস্পষ্টভাবে দৃষ্টিগোচর হয় এমন ধরনের নয়টি নিদর্শন দিয়ে পাঠিয়েছিলাম। সূরা আ’রাফে সেগুলোর বিস্তারিত বিবরণ বর্ণনা করা হয়েছেঃ
👩জেমি: সে নিদর্শন গুলো কি ছিল ?
💂পরিরাজ : সেগুলো হচ্ছে , (১) লাঠি, যা অজগর হয়ে যেতো (২) হাত, যা বগলে রেখে বের করে আনলে সূর্যের মতো ঝিকমিক করতো। (৩) যাদুকরদের প্রকাশ্য জনসমক্ষে পরাজিত করা (৪) হযরত মূসার পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী সারা দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়া। (৫) বন্যা ও ঝড় (৬) পংগপাল (৭) সমস্ত শস্য গুদামে শস্যকীট এবং মানুষ-পশু নির্বিশেষে সবার গায়ে উকুন। (৮) ব্যাঙয়ের আধিক্য (৯) রক্ত।
💂পরিরাজ: একইভাবে পবিত্র কুরআনের অন্য জায়গায় বলা হয়েছে'[৪২] সেখানে পৌঁছার পর উপত্যকার ডান কিনারায় পবিত্র ভূখণ্ডে একটি বৃক্ষ থেকে আহ্বান এলো, “হে মূসা! আমিই আল্লাহ, সমগ্র বিশ্বের অধিপতি।” আর (হুকুম দেয়া হলো) ছুঁড়ে দাও তোমার লাঠিটি। যখনই মূসা দেখলো লাঠিটি সাপের মতো মোচড় খাচ্ছে তখনই সে পেছন ফিরে ছুটতে লাগলো এবং একবার ফিরেও তাকালো না। বলা হলো, “হে মূসা! ফিরে এসো এবং ভয় করো না, তুমি সম্পূর্ণ নিরাপদ।
তোমার হাত বগলে রাখো উজ্জল হয়ে বের হয়ে আসবে কোন প্রকার কষ্ট ছাড়াই। এবং ভীতিমুক্ত হবার জন্য নিজের হাত দু’টি চেপে ধরো। এ দু’টি উজ্জল নিদর্শন তোমার রবের পক্ষ থেকে ফেরাউন ও তার সভাসদদের সামনে পেশ করার জন্য, তারা বড়ই নাফরমান।” মূসা নিবেদন করলো, “হে আমার প্রভু! আমি যে তাদের একজন লোককে হত্যা করে ফেলেছি, ভয় হচ্ছে, তারা আমাকে মেরে ফেলবে। আর আমার ভাই হারূন আমার চেয়ে বেশী বাকপটু, তাকে সাহায্যকারী হিসেবে আমার সাথে পাঠাও, যাতে সে আমাকে সমর্থন দেয়, আমার ভয় হচ্ছে, তারা আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করবে।”
আল্লাহ বললেন, তোমার ভাইয়ের সাহায্যে আমি তোমার শক্তি বৃদ্ধি করবো এবং তোমাদের দু’জনকে এমনই প্রতিপত্তি দান করবো যে, তারা তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আমার নিদর্শনগুলোর জোরে তোমরা ও তোমাদের অনুসারীরাই বিজয় লাভ করবে।”
💂পরিরাজ: একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, এটা হচ্ছে সেই তুর পাহাড় যার কথা কুরআনে কয়েক জায়গায় এসেছে। এখানে বলা হয়েছে [৪৩] এ কিতাবে মূসার বৃত্তান্তও বিবৃত কর। নিশ্চয়ই সে ছিল আল্লাহর মনোনীত বান্দা এবং (তাঁর) রাসূল ও নবী। আমি তাকে তুর পাহাড়ের ডান দিক থেকে ডাক দিলাম এবং তাকে আমার অন্তরঙ্গরূপে নৈকট্য দান করলাম। আর আমি তার ভাই হারুনকে নবী বানিয়ে নিজ রহমতে তাকে (একজন সাহায্যকারী) দান করলাম।
💂পরিরাজ: সূরা আ‘রাফে তা উল্লেখ করেছেন-[৪৪] আমি মূসার জন্য ত্রিশ রাতের মেয়াদ স্থির করেছিলাম (যে, এ রাতসমূহে তুর পাহাড়ে এসে ইতিকাফ করবে)। তারপর আরও দশ রাত বৃদ্ধি করে তা পূর্ণ করি। এভাবে তার প্রতিপালকের নির্ধারিত মেয়াদ চল্লিশ দিন হয়ে গেল এবং মূসা তার ভাই হারুনকে বলল, আমার অনুপস্থিতিতে তুমি সম্প্রদায়ের মধ্যে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে, সবকিছু ঠিকঠাক রাখবে এবং অশান্তি সৃষ্টিকারীদের অনুসরণ করবে না। মূসা যখন আমার নির্ধারিত সময়ে এসে পৌঁছল এবং তার প্রতিপালক তাঁর সাথে কথা বললেন, তখন সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দর্শন দিন আমি আপনাকে দেখব। তিনি বললেন, তুমি আমাকে কিছুতেই দেখতে পাবে না। তুমি বরং পাহাড়ের প্রতি দৃষ্টিপাত কর। তা যদি আপন স্থানে স্থির থাকে, তবে তুমি আমাকে দেখতে পারবে। অতপর যখন তার প্রতিপালক পাহাড়ে তাজাল্লী ফেললেন ( জ্যোতি প্রকাশ করলেন) তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচ‚র্ণ করে ফেলল এবং মূসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেল। পরে যখন তার সংজ্ঞা ফিরে আসল, তখন সে বলল,আপনার সত্তা পবিত্র।
আমি আপনার দরবারে তওবা করছি এবং (দুনিয়ায় কেউ আপনাকে দেখতে সক্ষম নয়- এ বিষয়ের প্রতি) আমি সবার আগে ঈমান আনছি।
💂পরিরাজ: এছাড়া মূসা ও ফেরাউন সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে বর্ণিত হয়েছে যেমন সূরা আল আরাফের (১০৩-১৩৭), আবার (৮৫-৯৩) নম্বর আয়াত। সূরা ইউনূস(৭৫-৯২), সূরা বনী ইসরাইল (১০১-১০৪), সূরা ত্ব-হা (৯-৭৯), সূরা নামল, সূরা কাসাস এর চার রুকুতে এবং সূরা দু'খান ২৪ নম্বর আয়াতে, সূরা ত্ব-হা এর তাফহীমুল কোরআন থেকে ৫৩নং টিকা, সূরা নাযিয়াতসহ আরও অনেকগুলো সূরা ও আয়াতে হযরত মূসা ও ফেরাউনের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। তুমি যদি মূসা ও ফেরাউন সম্পর্কে শুনতে চাও তাহলে অন্য একদিন বলব; আজ আরনা।
💂পরিরাজ: এখন তোমাকে ফের ওহী সম্পর্কে রেখে যাওয়া কথাগুলো বলছি, উপরে আলোচনায় বর্ণিত ওহির নাযিলের তৃতীয় পদ্ধতিটি হচ্ছে, ফেরেশতা মানুষের আকৃতি ধারণপূর্বক নাবী কারীম (সাঃ)-কে সম্বোধন করতেন। তারপর তিনি যা কিছু বলতেন নবী কারীম (সাঃ) তা মুখস্থ করে নিতেন। এ অবস্থায় সাহাবীগণ (রাঃ)ও ফেরেশতাকে দেখতে পেতেন।
💂পরিরাজ: এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, [৪৫] ওদেরকে বলে দাও, যে ব্যক্তি জিব্রীলের সাথে শত্রুতা করে, তার জেনে রাখা উচিত, জিব্রীল আল্লাহরই হুকুমে এই কুরআন তোমার দিলে অবতীর্ণ করেছে; এটি পূর্বে আগত কিতাবগুলোর সত্যতা স্বীকার করে ও তাদের প্রতি সমর্থন যোগায় এবং ঈমানদারদের জন্য পথনির্দেশনা ও সাফল্যের বার্তাবাহী।
💂পরিরাজ: ইহুদিরা কেবল নবী (সাঃ) এবং তাঁর ওপর যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকেই গালাগালি দিতো না বরং তারা আল্লাহর প্রিয় মহান ফেরেশতা জিব্রীলকেও গালাগালি দিতো এবং বলতো; সে আমাদের শত্রু। সে রহমতের নয়, আযাবের ফেরেশতা।
অর্থাৎ এ জন্যই তোমাদের গালমন্দ জিব্রীলের ওপর নয়, আল্লাহর মহান সত্তার ওপর আরোপিত হয়।
এর অর্থ হচ্ছে, জিব্রীল এ কুরআন মজীদ বহন করে এনেছেন বলেই তোমরা এ গালাগালি করছো। অথচ কুরআন সরাসরি তাওরাতকে সমর্থন যোগাচ্ছে। কাজেই তোমাদের গালিগালাজ তাওরাতের বিরুদ্ধেও উচ্চারিত হয়েছে।
💂পরিরাজ: এখানে একটি বিশেষ বিষয়বস্তুর প্রতি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত করা হয়েছে। সেটি হচ্ছেঃ ওহে নির্বোধের দল! তোমাদের সমস্ত অসন্তুষ্টি হচ্ছে হিদায়াত ও সত্য-সহজ পথের বিরুদ্ধে। তোমরা লড়ছো সঠিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে। অথচ এই সঠিক ও নির্ভুল নেতৃত্বকে সহজভাবে মেনে নিলে তা তোমাদের জন্য সাফল্যের সুসংবাদ বহন করে আনতো।
💂পরিরাজ: ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় নাবী কারীম (সঃ)-এর নিকট ঘন্টার টুন টুন ধ্বনির মতো ধ্বনি শোনা যেত। ওহী নাযিলের এটাই ছিল সব চাইতে কঠিন অবস্থা। টুন টুন ধ্বনির সংকেত প্রকাশ করতে করতে ফিরিশতা ওহী নিয়ে আগমন করতেন এবং নাবী (সঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। ওহী নাযিলের সময় কঠিন শীতের দিনেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কপাল থেকে ঘাম ঝরতে থাকত। তিনি উষ্ট্রের উপর আরোহণরত অবস্থায় থাকলে উট বসে পড়ত। এক দফা এইভাবে ওহী নাযিল হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উরু যায়দ বিন সাবেত (রা:)-এর উরুর উপর ছিল। তখন তাঁর উরুতে এতই ভারবোধ হয়েছিল যে মনে হয়েছিল যেন উরু চূর্ণ হয়ে যাবে।
💂পরিরাজ: নাবী কারীম (সঃ) ফিরিশতাকে কোন কোন সময় নিজস্ব জন্মগত আকৃতিতে প্রত্যক্ষ করতেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় সেই অবস্থাতেই তিনি তাঁর নিকট ওহী নিয়ে আগমন করতেন। নাবী কারীম (সঃ)-এর এ রকম অবস্থা দু’বার সংঘটিত হয়েছিল যা আল্লাহ তা‘আলা সূরাহ ‘নাজমে’ উল্লেখ করেছেন।
💂পরিরাজ: পবিত্র মি’রাজ রজনীতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন আকাশের উপর অবস্থান করছিলেন সেই সময় আল্লাহ তা‘আলা নামায এবং অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে সরাসরি হুকুমের মাধ্যমে ওহীর ব্যবস্থা করেছিলেন।
💂পরিরাজ: আল্লাহ তা‘আলার সঙ্গে নাবী কারীম (সাঃ)-এর সরাসরি কথোপকথন যেমনটি হয়েছিল, তেমনি মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে হয়েছিল।
কোন কোন লোক পর্দা বা আবরণ ব্যতিরেকে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সাঃ)-এর সামনা-সামনি কথোপকথনের মাধ্যমে ওহী নাযিলের অষ্টম রীতির কথা বলেছেন। কিন্তু ইসলামের পূর্বসূরীদের হতে শুরু করে পরবর্তীদের সময়কাল পর্যন্ত এ পদ্ধতিতে ওহী নাযিলের ব্যাপারে মতভেদ চলে আসছে।
👩জেমি : ওহী কী ধারাবাহিকভাবে নাযিল হয়েছে নাকি মাঝেমধ্যে বিরতি নিয়ে তারপর আবার নাযিল হয়েছে।
💂পরিরাজ: বলছি;
💂পরিরাজ: মহানবী (সাঃ) বিশ্ব মানবতার মুক্তির জন্য বিশেষ করে আরব সমাজের বিরাজমান অন্যায় অশান্তি ও মানুষের প্রভুত্ব থেকে কীভাবে মুক্তি পেতে পারে এ চিন্তায় মগ্ন ছিলেন তিনটি বছর। পারিপার্শ্বিক হৈচৈ ও হট্রগোল থেকে নির্জনতায় ও কোলাহল মুক্ত পরিবেশে হেরা গুহায় আধ্যাত্মিক ও রুহানি সফরে সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে গভীর ভাবনার পর তার ওপর প্রথম ওহী আসে পবিত্র রমজানের কদরের রজনীতে সূরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত, দশ দিন বিরতির পর দ্বিতীয় ওহী আসে সূরা মুদ্দাসসিরের প্রথম প্রথম পাঁচ আয়াত।
💂পরিরাজ: ওহী স্থগিত হওয়া প্রসঙ্গে নবী (সাঃ) বলেন, [৪৬] একদা আমি হেঁটে চলছি, হঠাৎ আকাশ থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পেয়ে চোখ তুলে তাকালাম! দেখলাম, সেই ফিরিশতা, যিনি হেরায় আমার কাছে এসেছিলেন, আসমান ও যমীনের মাঝখানে একটি কুরসীতে বসে আছেন, এতে আমি ভয় পেয়ে গেলাম, তৎক্ষণাৎ আমি ফিরে এসে বললাম আমাকে বস্ত্রাবৃত কর! আমাকে বস্ত্রাবৃত কর! তারপর আল্লাহতায়ালা নাযিল করলেন,
👉কোরআন : হে বস্ত্র মুড়ি দিয়ে শয়নকারী!
💂পরিরাজ: এখানে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ইয়া আয়্যুহাল রাসূল বা (ইয়া আয়্যুহান্নাবীয়ু) বলে সম্বোধন করার পরিবর্তে (ইয়া আয়্যুহাল মুদ্দাস্সির) বলে সম্বোধন কেন করা হয়েছে। নবী (সাঃ) যেহেতু হঠাৎ জিবরাঈলকে আসমান ও পৃথিবীর মাঝখানে একটি আসনে উপবিষ্ট দেখে ভীত হয়ে পড়েছিলেন এবং সে অবস্থায় বাড়ীতে পৌঁছে বাড়ীর লোকদের বলেছিলেনঃ আমাকে চাদর দিয়ে আচ্ছাদিত করো, আমাকে চাদর দিয়ে আচ্ছাদিত করো। তাই আল্লাহ তাঁকে (ইয়া আয়্যুহাল মুদ্দাস্সির) বলে সম্বোধন করেছেন।
💂পরিরাজ: সম্বোধনের এ সূক্ষ্ম ভংগী থেকে আপনা আপনি এ অর্থ পরিস্ফূটিত হয়ে ওঠে যে, হে আমার প্রিয় বান্দা, তুমি চাদর জড়িয়ে শুয়ে আছো কেন? তোমার ওপরে তো একটি মহৎ কাজের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। এ দায়িত্ব পালন করার জন্য তোমাকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উঠে দাঁড়াতে হবে।
👉কোরআন : ওঠো এবং সাবধান করে দাও,
💂পরিরাজ: হযরত নূহ আলাইহিস সালামকে নবুওয়াতের পদমর্যাদায় অভিষিক্ত করার সময় যে আদেশ দেয়া হয়েছিল এটাও সে ধরনের আদেশ। হযরত নূহ আলাইহিস সালামকে বলা হয়েছিলঃ [৪৭] “তোমার নিজের কওমের লোকদের ওপর এক ভীষণ কষ্টদায়ক আযাব আসার পূর্বেই তাদের সাবধান করে দাও।”
💂পরিরাজ: আয়াতটির অর্থ হলো, হে বস্ত্র আচ্ছাদিত হয়ে শয়নকারী, তুমি ওঠো। তোমার চারপাশে আল্লাহর যেসব বান্দারা অবচেতন পড়ে আছে তাদের জাগিয়ে তোল। যদি এ অবস্থায়ই তারা থাকে তাহলে যে অবশ্যম্ভাবী পরিণতির সম্মুখীন তারা হতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে তাদের সাবধান করে দাও। তাদের জানিয়ে দাও, তারা “মগের মুল্লুকে” বাস করছে না যে, যা ইচ্ছা তাই করে যাবে, অথচ কোন কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হবে না।
👉কোরআন : তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো,
💂পরিরাজ: এ পৃথিবীতে এটা একজন নবীর সর্বপ্রথম কাজ। এখানে এ কাজটিই তাঁকে আঞ্জাম দিতে হয়। তাঁর প্রথম কাজই হলো, অজ্ঞ ও মূর্খ লোকেরা এ পৃথিবীতে যাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রতাপ মেনে চলছে তাদের সবাইকে অস্বীকার করবে এবং গোটা পৃথিবীর সামনে উচ্চ কণ্ঠে একথা ঘোষণা করবে যে, এ বিশ্ব-জাহানে এক আল্লাহ ছাড়া আর কারো কোন শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রতাপ নেই।
💂পরিরাজ: আর এ কারণেই ইসলামে “আল্লাহু আকবার” (আল্লাহই শ্রেষ্ঠ) কথাটিকে সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। “আল্লাহু আকবার” ঘোষণার মাধ্যমেই আযান শুরু হয়। আল্লাহু আকবার একথাটি বলে মানুষ নামায শুরু করে এবং বার বার আল্লাহু আকবার বলে ওঠে ও বসে। কোন পশুকে জবাই করার সময়ও “বিসমিল্লাহে আল্লাহু আকবার” বলে জবাই করে। তাকবীর ধ্বনি বর্তমান বিশ্বে মুসলমানদের সর্বাধিক স্পষ্ট ও পার্থক্যসূচক প্রতীক। কারণ, ইসলামের মহানবী (সাঃ) আল্লাহর বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণার মাধ্যমেই কাজ শুরু করেছিলেন।
💂পরিরাজ: এখানে আরো একটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে যা ভালভাবে বুঝে নেয়া দরকার। এ সময়ই প্রথমবারের মত রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে নবুওয়াতের বিরাট গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য তৎপর হতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এ আয়াতগুলোর “শানে নুযুল” থেকেই সে বিষয়টি জানা গিয়েছে। একথা তো স্পষ্ট যে, যে শহর, সমাজ ও পরিবেশে তাঁকে এ উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে কাজ করার জন্য তৎপর হওয়ার নির্দেশ দেয়া হচ্ছিল তা ছিল শিরকের কেন্দ্রভূমি বা লীলাক্ষেত্র। সাধারণ আরবদের মত সেখানকার অধিবাসীরা যে কেবল মুশরিক ছিল, তা নয়। বরং মক্কা সে সময় গোটা আরবের মুশরিকদের সবচেয়ে বড় তীর্থক্ষেত্রের মর্যাদা লাভ করেছিল।
আর কুরাইশরা ছিল তার ঘনিষ্ঠতম প্রতিবেশী, সেবায়ত ও পুরোহিত। এমন একটি জায়গায় কোন ব্যক্তির পক্ষে শিরকের বিরুদ্ধে এককভাবে তাওহীদের পতাকা উত্তোলন করা জীবনের ঝুঁকি গ্রহণ করার শামিল। তাই “ওঠো এবং সাবধান করে দাও” বলার পরপরই “তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো” বলার অর্থই হলো যেসব বড় বড় সন্ত্রাসী শক্তি তোমার এ কাজের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে হয় তাদের মোটেই পরোয়া করো না। বরং স্পষ্ট ভাষায় বলে দাও, যারা আমার এ আহবান ও আন্দোলনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে আমার “রব” তাদের সবার চেয়ে অনেক বড়। আল্লাহর দ্বীনের কাজ করতে উদ্যত কোন ব্যক্তির হিম্মত বৃদ্ধি ও সাহস যোগানোর জন্য এর চাইতে বড় পন্থা বা উপায় আর কি হতে পারে? আল্লাহর বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের নকশা যে ব্যক্তির হৃদয়-মনে খোদিত সে আল্লাহর জন্য একাই গোটা দুনিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে সামান্যতম দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও অনুভব করবে না।
👉কোরআন : তোমার পোশাক পবিত্র রাখো,
💂পরিরাজ: এটি একটি ব্যাপক অর্থ ব্যঞ্জক কথা। এর অর্থ অত্যন্ত বিস্তৃত। এর একটি অর্থ হলো, তুমি তোমার পোশাক-পরিচ্ছদ নাপাক বস্তু থেকে পবিত্র রাখো। কারণ শরীর ও পোশাক-পরিচ্ছদের পবিত্রতা এবং “রূহ” বা আত্মার পবিত্রতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কোন পবিত্র আত্মা ময়লা-নোংরা ও পূতিগন্ধময় দেহ এবং অপবিত্র পোশাকের মধ্যে মোটেই অবস্থান করতে পারে না। রসূলুল্লাহ (সাঃ) যে সমাজে ইসলামের দাওয়াতের কাজ শুরু করেছিলেন তা শুধু আকীদা-বিশ্বাস ও নৈতিক আবিলতার মধ্যেই নিমজ্জিত ছিল না
বরং পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার প্রাথমিক ধারণা সম্পর্কে পর্যন্ত সে সমাজের লোক অজ্ঞ ছিল। এসব লোককে সব রকমের পবিত্রতা শিক্ষা দেয়া ছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাজ। তাই তাঁকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, তিনি যেন তাঁর বাহ্যিক জীবনেও পবিত্রতার সর্বোচ্চ মান বজায় রাখেন।
এ নির্দেশের ফল স্বরূপ নবী (সাঃ) মানবজাতিকে শরীর ও পোশাক-পরিচ্ছদের পবিত্রতা সম্পর্কে এমন বিস্তারিত শিক্ষা দিয়েছেন যে, জাহেলী যুগের আরবরা তো দূরের কথা আধুনিক যুগের চরম সভ্য জাতিসমূহও সে সৌভাগ্যের অধিকারী নয়। এমনকি দুনিয়ার অধিকাংশ ভাষাতে এমন কোন শব্দ পর্যন্ত পাওয়া যায় না যা “তাহারাত” বা পবিত্রতার সমার্থক হতে পারে। পক্ষান্তরে ইসলামের অবস্থা হলো, হাদীস এবং ফিকাহর গ্রন্থসমূহে ইসলামী হুকুম-আহকাম তথা বিধি-বিধান সম্পর্কে সব আলোচনা শুরু হয়েছে “কিতাবুল তাহারাত” বা পবিত্রতা নামে অধ্যায় দিয়ে। এতে পবিত্রতা ও অপবিত্রতার পার্থক্য এবং পবিত্রতা অর্জনের উপায় ও পন্থাসমূহ একান্ত খুঁটিনাটি বিষয়সহ সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে।
💂পরিরাজ: একথাটির দ্বিতীয় অর্থ হলো, নিজের পোশাক-পরিচ্ছদ পরিষ্কার-পরিছন্ন রাখো। বৈরাগ্যবাদী ধ্যান-ধারণা পৃথিবীতে ধর্মাচরণের যে মানদণ্ড বানিয়ে রেখেছিল তাহলো, যে মানুষে যাতো বেশী নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন হবে সে ততো বেশী পূত-পবিত্র। কেউ কিছুটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাপড় পরলেই মনে করা হতো, সে একজন দুনিয়াদার মানুষ। অথচ মানুষের প্রবৃত্তি নোংরা ও ময়লা জিনিসকে অপছন্দ করে। তাই ঘোষণা করা হয়েছে যে, আল্লাহর পথে আহ্বানকারীর বাহ্যিক অবস্থাও এতোটা পবিত্র ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়া প্রয়োজন যেন মানুষ তাকে সম্মান ও মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখে এবং তার ব্যক্তিত্বে এমন কোন দোষ-ত্রুটি যেন না থাকে যার কারণে রুচি ও প্রবৃত্তিতে তার প্রতি ঘৃণার সৃষ্টি হয়।
💂পরিরাজ: একথাটির তৃতীয় অর্থ হলো, নিজের পোশাক পরিচ্ছদ নৈতিক দোষ-ত্রুটি থেকে পবিত্র রাখো। তোমার পোশাক-পরিচ্ছদ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন তো অবশ্যই থাকবে তবে তাতেও কোন প্রকার গর্ব-অহংকার, প্রদর্শনী বা লোক দেখানোর মনোবৃত্তি, ঠাটবাট এবং জৌলুসের নামগন্ধ পর্যন্ত থাকা উচিত নয়।
💂পরিরাজ: পোশাক এমন একটি প্রাথমিক জিনিস যা অন্যদের কাছে একজন মানুষের পরিচয় তুলে ধরে। কোন ব্যক্তি যে ধরনের পোশাক পরিধান করে তা দেখে প্রথম দৃষ্টিতেই মানুষ বুঝতে পারে যে, সে কেমন স্বভাব চরিত্রের লোক। নওয়াব, বাদশাহ ও নেতৃ পর্যায়ের লোকদের পোশাক, ধর্মীয় পেশার লোকদের পোশাক, দাম্ভিক ও আত্মম্ভরী লোকদের পোশাক, বাজে ও নীচ স্বভাব লোকদের পোশাক এবং গুণ্ডা-পাণ্ডা ও বখাটে লোকদের পোশাকের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে থাকে। এসব পোশাকই পোশাক পরিধানকারীর মেজাজ ও মানসিকতার প্রতিনিধিত্ব করে। আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর মেজাজ ও মানসিকতা স্বাভাবিকভাবেই এসব লোকদের থেকে আলাদা হয়ে থাকে। তাই তার পোশাক-পরিচ্ছদ তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে স্বতন্ত্র ধরনের হওয়া উচিত। তাঁর উচিত এমন পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান করা যা দেখে প্রত্যেকেই অনুভব করবে যে, তিনি একজন শরীফ ও ভদ্র মানুষ, যাঁর মন-মানস কোন প্রকার দোষে দুষ্ট নয়।
💂পরিরাজ: এর চতুর্থ অর্থ হলো, নিজেকে পবিত্র রাখো। অন্য কথায় এর অর্থ হলো, নৈতিক দোষ-ত্রুটি থেকে পবিত্র থাকা এবং উত্তম নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হওয়া। ইবনে আব্বাস, ইবরাহীম নাখয়ী, শা’বী, আতা, মুজাহিদ, কাতাদা, সা’ঈদ ইবনে জুবায়ের, হাসান বাসরী এবং আরো অনেক বড় বড় মুফাসসিরের মতে এটিই এ আয়াতের অর্থ। অর্থাৎ নিজের নৈতিক চরিত্রকে পবিত্র রাখো এবং সব রকমের দোষ-ত্রুটি থেকে দূরে থাকো।
প্রচলিত আরবী প্রবাদ অনুসারে যদি বলা হয় যে, অমুক ব্যক্তির কাপড় বা পোশাক পবিত্র অথবা অমুক ব্যক্তি পবিত্র।” তাহলে এর দ্বারা বুঝানো হয় যে, সে ব্যক্তির নৈতিক চরিত্র খুবই ভাল। পক্ষান্তরে যদি বলা হয় অমুক ব্যক্তির পোশাক নোংরা তাহলে এ দ্বারা বুঝানো হয় যে, লোকটি লেনদেন ও আচার-আচরণের দিক দিয়ে ভাল নয়। তার কথা ও প্রতিশ্রুতির উপর আস্থা রাখা যায় না।
👉কোরআন : অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকো,
💂পরিরাজ: অপবিত্রতার অর্থ সব ধরনের অপবিত্রতা। তা আকীদা-বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণার অপবিত্রতা হতে পারে, নৈতিক চরিত্র ও কাজ-কর্মের অপবিত্রতা হতে পারে।
আবার শরীর ও পোশাক-পরিচ্ছদ এবং উঠা বসা চলাফেরার অপবিত্রতাও হতে পারে।
💂পরিরাজ: অর্থাৎ তোমার চারদিকে গোটা সমাজে হরেক রকমের যে অপবিত্রতা ও নোংরামী ছড়িয়ে আছে তার সবগুলো থেকে নিজেকে মুক্ত রাখো।
💂পরিরাজ: কেউ যেন তোমাকে একথা বলার সামান্য সুযোগও না পায় যে, তুমি মানুষকে যেসব মন্দ কাজ থেকে নিবৃত্ত করছো তোমার নিজের জীবনেই সে মন্দের প্রতিফলন আছে।
💂পরিরাজ: ওহী সম্পর্কে ইসলামী পণ্ডিত সফি উসমানী মা'আরেফুল কোরআনের ভূমিকায় বলেছেন," আল্লাহ থেকে মানবজাতি তিনটি মাধ্যমে ইলম লাভ করে, ইন্দ্রিয়, বিবেক এবং ওহীর মাধ্যমে। যার শেষটি শুধুমাত্র নবী রাসূল পেয়ে থাকে। হেদায়াত দানের উদ্দেশ্যে আল্লাহ যুগে যুগে নবী -রাসূল প্রেরণ করেছেন। যার প্রথম হযরত আদম (আঃ) আর সর্বশেষ হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)। আর ওহীর মাধ্যমে আল্লাহ বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে তার বাণী নবী রাসূলদের কাছে অবতীর্ণ করেন। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী মুহাম্মদ (সাঃ) শেষ রাসূল বিধায় পৃথিবীতে আর কোন ওহী আসবে না। "
💂পরিরাজ: সূরা আলাকের কয়খানি আয়াত দিয়ে কুরআন নাজিল শুরু হয় এবং বিদায় হজ্জের খুতবা শেষে আরাফাত ময়দানে ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে ৯ জিলহজ একটি আয়াতের অংশবিশেষ হিসেবে সর্বশেষ যে ওহী নাজিল হয় তা হচ্ছে : [৪৮] আল ইয়াওমা আক্মালতু লাকুম দীনাকুম ওয়া আত্মামতু ‘আলায়কুম নিমাতী ওয়া রাদীতু লাকুমুল ইসলামা দীনা। আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের দীন ইসলামকে সানন্দ অনুমোদন দান করলাম।
💂পরিরাজ: মূলত শরিয়ত, তরিকত, হকিকত ও মারেফাতের দুর্বার গতিধারার অগ্রসফরের নবদিগন্ত উন্মোচিত হয় সেদিন হেরা গুহায় কুরআন নাজিলের মধ্য দিয়ে। এই কুরআন হচ্ছে মানুষের দিশারী, সৎ পথের স্পষ্ট নিদর্শন এবং সত্য - মিথ্যার পার্থক্যকারী।
👩জেমি: মূসা (আঃ) যে বলল, সে একজনকে হত্যা করেছে, সে কাকে হত্যা করেছে? কেন হত্যা করেছে? সে বিস্ময়কর কাহিনি কী?
💂পরিরাজ: সে অনেক ঘটনা,
👩জেমি: আমি সে রহস্যময় ঘটনা শুনতে চাই...
💕নবীন প্রেমের উদয়! 👉দ্বিতীয় খণ্ড👉 পর্ব: বারো
, সমাপ্ত।।
👉রচনাকাল: সংশোধিত, ১ নভেম্বর ২০২২ মঙ্গলবার।।
👉বিশেষ দ্রষ্টব্য: কপিরাইট সংরক্ষিত৷
আর আমার জন্য নিজের পরিবার থেকে সাহায্যকারী হিসেবে নিযুক্ত করে দাও! আমার ভাই হারুনকে।
💂পরিরাজ: বাইবেলের বর্ণনা অনুসারে [৩৭] হযরত হারুন হযরত মূসার চাইতে তিন বছরের বড় ছিলেন।
মূসা বললেন, তার মাধ্যমে আমার হাত মজবুত করো। এবং তাকে আমার কাজে শরীক করে দাও, যাতে আমরা খুব বেশী করে তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করতে পারি, এবং খুব বেশী করে তোমার চর্চা করি। তুমি সব সময় আমাদের অবস্থার পর্যবেক্ষক।” বললেন, “হে মূসা! তুমি যা চেয়েছো তা তোমাকে দেয়া হলো। আমি আর একবার তোমার প্রতি অনুগ্রহ করলাম।
💂পরিরাজ: এরপর আল্লাহ হযরত মূসাকে তাঁর জন্ম থেকে নিয়ে এ পর্যন্ত তার প্রতি যতগুলো অনুগ্রহ করা হয়েছিল, এক এক করে তার সবক’টি তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেন। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে হযরত মূসাকে এ অনুভূতি দান করা যে, এখন যে কাজে তোমাকে নিযুক্ত করা হচ্ছে এ কাজের জন্যই তোমাকে পয়দা করা হয়েছে এবং এ কাজের জন্যই আজ পর্যন্ত বিশেষ সরকারী তত্ত্বাবধানে তুমি প্রতিপালিত হয়ে এসেছো।
💂পরিরাজ: আল্লাহ মূসাকে বললেন, সে সময়ের কথা মনে করো যখন আমি তোমার মাকে ইশারা করেছিলাম, এমন ইশারা যা অহীর মাধ্যমে করা হয়, এই মর্মে যে, এ শিশুকে সিন্দুকের মধ্যে রেখে দাও এবং সিন্দুকটি দরিয়ায় ভাসিয়ে দাও, দরিয়া তাকে তীরে নিক্ষেপ করবে এবং আমার শত্রু ও এ শিশুর শত্রু একে তুলে নেবে। আমি নিজের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি ভালোবাসা সঞ্চার করেছিলাম এবং এমন ব্যবস্থা করেছিলাম যাতে তুমি আমার তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হও।
স্মরণ করো, যখন তোমার বোন চলছিল, তারপর গিয়ে বললো, “আমি কি তোমাদের তার সন্ধান দেবো, যে এ শিশুকে ভালোভাবে লালন করবে?” এভাবে আমি তোমাকে আবার তোমার মায়ের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়েছি, যাতে তার চোখ শীতল থাকে এবং সে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত না হয়। এবং (এটাও স্মরণ করো) তুমি একজনকে হত্যা করে ফেলেছিলে, আমি তোমাকে এ ফাঁদ থেকে বের করেছি এবং তোমাকে বিভিন্ন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে নিয়ে এসেছি, আর তুমি মাদইয়ানবাসীদের মধ্যে কয়েক বছর অবস্থান করেছিলে। তারপর এখন তুমি ঠিক সময়েই এসে গেছো। হে মূসা! আমি তোমাকে নিজের জন্য তৈরী করে নিয়েছি।
যাও, তুমি ও তোমার ভাই আমার নিদর্শনগুলোসহ এবং দেখো আমার স্মরণে ভুল করো না। যাও, তোমরা দু’জন ফেরাউনের কাছে, সে বিদ্রোহী হয়ে গেছে। তার সাথে কোমলভাবে কথা বলো, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভীত হবে।” উভয়েই বললো, “হে আমাদের রব! আমাদের ভয় হয়, সে আমাদের সাথে বাড়াবাড়ি করবে অথবা আমাদের ওপর চড়াও হবে।”
💂পরিরাজ: এটা এমন সময়ের কথা হতে পারে যখন হযরত মূসা (আঃ) মিসরে পৌঁছে গিয়েছিলেন এবং হযরত হারুন কার্যত তাঁর সাথে শরীক হয়ে গিয়েছিলেন। সে সময় ফেরাউনের কাছে যাওয়ার আগে উভয়েই আল্লাহর কাছে এ নিবেদন পেশ করে থাকবেন।
আল্লাহ বললেন, “ভয় করো না, আমি তোমাদের সাথে আছি, সবকিছু শুনছি ও দেখছি।
যাও তার কাছে এবং বলো, আমরা তোমার রবের প্রেরিত, বনী ইসরাঈলকে আমাদের সাথে যাওয়ার জন্য ছেড়ে দাও এবং তাদেরকে কষ্ট দিয়ো না। আমরা তোমার কাছে নিয়ে এসেছি তোমার রবের নিদর্শন এবং শান্তি তার জন্য যে সঠিক পথ অনুসরণ করে। আমাদের অহীর সাহায্যে জানানো হয়েছে যে, শাস্তি তার জন্য যে মিথ্যা আরোপ করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়।”
💂পরিরাজ: এ ঘটনাটি বাইবেল ও তালমূদে যেভাবে পেশ করা হয়েছে তার ওপরও একবার নজর বুলানো দরকার। এর ফলে কুরআন মজীদ আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের কথা কেমন মর্যাদা সহকারে বর্ণনা করেছে এবং বনী ইসরাঈলের বর্ণনসমূহে এর কি চিত্র অংকন করা হয়েছে তা আন্দাজ করা যাবে। [৩৮] বাইবেলের বর্ণনা হচ্ছে, প্রথমবার আল্লাহ যখন মূসাকে বললেন, “এখন আমি তোমাকে ফেরাউনের কাছে পাঠাচ্ছি এ উদ্দেশ্যে যে, তুমি আমার জাতি বনী ইসরাঈলকে মিসর থেকে বের করে আনবে” তখন হযরত মূসা জবাব দিলেন, “ফেরাউনের কাছে যাবার এবং বনী ইসরাঈলকে মিসর থেকে বের করে আনার আমি কে? ” তারপর আল্লাহ হযরত মূসাকে অনেক বুঝালেন, তাঁর মনে শক্তি সঞ্চার করলেন, মুজিযা দান করলেন কিন্তু মূসা আবার এ কথাই বললেন, “হে আমার প্রভু বিনয় করি, অন্য যাহার হাতে পাঠাইতে চাও এ বার্তা পাঠাও।”
💂পরিরাজ: তালমূদের বর্ণনা আবার এর চাইতে কয়েক কদম এগিয়ে গেছে। সেখানে বলা হয়েছেঃ এ ব্যাপারটি নিয়ে আল্লাহ ও হযরত মূসার সাথে সাতদিন পর্যন্ত বাদানুবাদ হতে থাকে। আল্লাহ বলতে থাকেন, নবী হও। কিন্তু মূসা বলতে থাকেন, আমার কণ্ঠই খুলছে না, কাজেই আমি নবী হই কেমন করে। শেষে আল্লাহ বললেন, তুমি নবী হয়ে যাও এতেই আমি খুশী। একথায় হযরত মূসা বলেন, লূতকে বাঁচাবার জন্য আপনি ফেরেশতা পাঠিয়েছিলেন,
হাজেরা যখন সারার গৃহ থেকে বের হলেন তখন তার জন্য পাঁচজন ফেরেশতা পাঠিয়েছিলেন, আর এখন নিজের বিশেষ সন্তান (বনী ইসরাঈল)-দেরকে মিসর থেকে বেরকরে আনার জন্য আপনি আমাকে পাঠাচ্ছেন? একথায় আল্লাহ অসন্তুষ্ট হলেন এবং তিনি রিসালাতের কাজে তাঁর সাথে হারুনকে শরীক করে দিলেন। আর মূসার সন্তানদের বঞ্চিত করে পৌরোহিত্যের দায়িত্ব সন্তানদের দিয়ে দিলেন-এগুলোই হচ্ছে প্রাচীন কিতাব এবং নির্লজ্জ লোকেরা এগুলো সম্পর্কে বলে থাকে যে, কুরআনের এ কাহিনীগুলো নাকি এসব কিতাব থেকে নকল করা হয়েছে।
💂পরিরাজ: এ কুরআনে যেসব কথা বলা হচ্ছে এগুলো কোন উড়ো কথা নয়। এগুলো কোন মানুষের আন্দাজ অনুমান ও মতামত ভিত্তিকও নয়। বরং এক জ্ঞানবান প্রাজ্ঞ সত্তা এগুলো নাযিল করছেন। তিনি নিজের সৃষ্টির প্রয়োজন ও কল্যাণ এবং তার অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত সম্পর্কে পুরোপুরি জানেন। বান্দাদের সংশোধন ও পথনির্দেশনার জন্য তাঁর জ্ঞান সর্বোত্তম কৌশল ও ব্যবস্থা অবলম্বন করে।
💂পরিরাজ: পবিত্র কোরআনে আরও বলা হয়েছে, [৩৯] (তাদেরকে সেই সময়ের কথা শুনাও) যখন মূসা তাঁর পরিবারবর্গকে বললো “আমি আগুনের মতো একটা বস্তু দেখেছি। এখনি আমি সেখান থেকে কোন খবর আনবো অথবা খুঁজে আনবো কোন অংগার, যাতে তোমরা উষ্ণতা লাভ করতে পারো।”
💂পরিরাজ: এটা তখনকার ঘটনা যখন হযরত মূসা আলাইহিস সালাম মাদয়ানে আট দশ বছর অবস্থান করার পর নিজের পরিবার-পরিজন নিয়ে কোন বাসস্থানের সন্ধানে বের হয়েছিলেন। মাদয়ান এলাকাটি ছিল আকাবা উপসাগরের তীরে আরব ও সিনাই উপদ্বীপের উপকূলে, সেখান থেকে যাত্রা করে হযরত মূসা সিনাই উপদ্বীপের দক্ষিণ অংশে পৌঁছেন। এ অংশের যে স্থানটিতে তিনি পৌঁছেন বর্তমানে তাকে সিনাই পাহাড় ও মূসা পর্বত বলা হয়। কুরআন নাযিলের সময় এটি তুর নামে পরিচিত ছিল। এখানে যে ঘটনাটির কথা বলা হয়েছে সেটি এরই পাদদেশে সংঘটিত হয়েছিল।
💂পরিরাজ: আলোচনার প্রেক্ষাপট থেকে মনে হয় যে, এটা ছিল শীতকালের একটি রাত। হযরত মূসা একটি অপরিচিত এলাকা অতিক্রম করছিলেন। এ এলাকার ব্যাপারে তাঁর বিশেষ জানা-শোনা ছিল না। তাই তিনি নিজের পরিবারের লোকদের বললেন, আমি সামনের দিকে গিয়ে একটু জেনে আসি আগুন জ্বলছে কোন জনপদে, সামনের দিকে পথ কোথায় কোথায় গিয়েছে এবং কাছাকাছি কোন কোন জনপদ আছে। তবুও যদি দেখা যায়, ওরাও আমাদের মত চলমান মুসাফির যাদের কাছ থেকে কোন তথ্য সংগ্রহ করা যাবে না, তাহলেও অন্ততপক্ষে ওদের কাছ থেকে একটু অংগার তো আনা যাবে। এ থেকে আগুন জ্বালিয়ে তোমরা উত্তাপ লাভ করতে পারবে।
💂পরিরাজ: হযরত মূসা (আঃ) যেখানে কুঞ্জবনের মধ্যে আগুন লেগেছে বলে দেখেছিলেন সে স্থানটি তূর পাহাড়ের পাদদেশে সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার ফুট ওপরে অবস্থিত। রোমান সাম্রাজ্যের প্রথম খৃস্টান বাদশাহ কনষ্টানটাইন ৩৬৫ খৃস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে ঠিক যে জায়গায় এ ঘটনাটি ঘটেছিল সেখানে একটি গীর্জা নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। এর দু’শো বছর পরে সম্রাট জাষ্টিনিয়ান এখানে একটি আশ্রম (Monasterery) নির্মাণ করেন। কনষ্টান্টাইনের গীর্জাকেও এর অর্ন্তভূক্ত করা হয়। এ আশ্রম ও গীর্জা আজও অক্ষুন্ন রয়েছে। এটি গ্রীক খৃস্টীয় গীর্জার (Greek Orthodox Church) পাদরী সমাজের দখলে রয়েছে।
💂পরিরাজ: সেখানে পৌঁছবার পর আওয়াজ এলো “ধন্য সেই সত্তা যে এ আগুনের মধ্যে এবং এর চারপাশে রয়েছে, পাক-পবিত্র আল্লাহ সকল বিশ্ববাসীর প্রতিপালক।
💂পরিরাজ: সূরা কাসাসে বলা হয়েছে, আওয়াজ আসছিল একটি বৃক্ষ থেকে এ থেকে ঘটনাটির যে দৃশ্য সামনে ভেসে ওঠে তা হচ্ছে এই যে, উপত্যাকা এক কিনারে আগুনের মতো লেগে গিয়েছিল কিন্তু কিছু জ্বলছিল না এবং ধোঁয়াও উড়ছিল না। আর এ আগুনের মধ্যে একটি সবুজ শ্যামল গাছ দাঁড়িয়েছিল। সেখান থেকে সহসা এ আওয়াজ আসতে থাকে।
💂পরিরাজ: আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের সাথে এ ধরণের অদ্ভূত ব্যাপার ঘটা চিরাচরিত ব্যাপার। নবী (সাঃ) যখন প্রথম বার নবুওয়াতের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন তখন হেরা গিরিগূহায় একান্ত নির্জনে সহসা একজন ফেরেশতা আসেন।
💂পরিরাজ: তিনি তাঁর কাছে আল্লাহর পয়গাম পৌঁছাতে থাকেন। হযরত মূসার ব্যাপারেও একই ঘটনা ঘটে। এক ব্যক্তি সফর কালে এক জায়গায় অবস্থান করছেন। দূর থেকে আগুন দেখে পথের সন্ধান নিতে বা আগুন সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে আসেন। অকস্মাৎ সকল প্রকার আন্দাজ অনুমানের ঊর্ধ্বে অবস্থানকারী স্বয়ং আল্লাহ তাঁকে সম্বোধন করেন। এসব সময় আসলে এমন একটি অস্বাভাবিক অবস্থা বাইরেও এবং নবীগণের মনের মধ্যেও বিরাজমান থাকে যার ভিত্তিতে তাঁদের মনে এরূপ প্রত্যয় জন্মে যে, এটা কোন জিন বা শয়তানের কারসাজী অথবা তাদের নিজেদের কোন মানসিক ভাবান্তর নয় কিংবা তাঁদের ইন্দ্রিয়ানুভূতিও কোন প্রকার প্রতারিত হচ্ছে না বরং প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব-জাহানের মালিক ও প্রভু অথবা তাঁর ফেরেশতাই তাঁদের সাথে কথা বলা হয়েছে।
💂পরিরাজ: এ অবস্থায় “পাক-পবিত্র আল্লাহ” বলার মাধ্যমে আসলে হযরত মূসাকে এ ব্যাপারে সতর্ক করা হচ্ছে যে, বিভ্রান্ত চিন্তা ও বিশ্বাস থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়েই এ ঘটনাটি ঘটছে। অর্থাৎ এমন নয় যে, আল্লাহ রব্বুল আলামীন এ গাছের ওপর বসে আছেন অথবা এর মধ্যে অনুপ্রবেশ করে এসেছেন কিংবা তাঁর একচ্ছত্র নূর তোমাদের দৃষ্টিসীমায় বাঁধা পড়েছে বা কারো মুখে প্রবিষ্ট কোন জিহ্বা নড়াচড়া করে এখানে কথা বলছে। বরং এ সমস্ত সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত ও পরিচ্ছন্ন থেকে সেই সত্তা নিজেই তোমার সাথে কথা বলছেন।
💂পরিরাজ: আল্লাহ বললেন; হে মূসা, এ আর কিছু নয়, স্বয়ং আমি আল্লাহ, পরাক্রমশালী ও জ্ঞানী।
এবং তুমি তোমার লাঠিটি একটু ছুঁড়ে দাও।” যখনই মূসা দেখলো লাঠি সাপের মত মোচড় খাচ্ছে, তখনই পেছন ফিরে ছুটতে লাগলো এবং পেছন দিকে ফিরেও দেখলো না। “হে মূসা! ভয় পেয়ো না, আমার সামনে রসূলরা ভয় পায় না।
💂পরিরাজ: সূরা আ’রাফে ও সূরা শু’আরাতে এজন্য (অজগর) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু এখানে একে জান শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে। “জান” শব্দটি বলা হয় ছোট সাপ অর্থে। এখানে “জান” শব্দ ব্যবহার করার কারণ হচ্ছে এই যে, দৈহিক দিক দিয়ে সাপটি ছিল অজগর কিন্তু তার চলার দ্রুততা ছিল ছোট সাপদের মতো। সূরা তা-হায় (ছুটন্ত সাপ) এর মধ্যেও এ অর্থই বর্ণনা করা হয়েছে।
💂পরিরাজ: অর্থাৎ আমার কাছে রসূলদের ক্ষতি হবার কোন ভয় নেই। রিসালাতের মহান মর্যাদায় অভিসিক্ত করার জন্য যখন আমি কাউকে নিজের কাছে ডেকে আনি তখন আমি নিজেই তার নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়ে থাকি। তাই যে কোন প্রকার অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটলেও রসুলকে নির্ভীক ও নিশ্চিন্ত থাকা উচিত। আমি তার জন্য কোন প্রকার ক্ষতিকারক হবো না।
তবে হ্যাঁ, যদি কেউ ভুল-ত্রুটি করে বসে। তারপর যদি সে দুষ্কৃতির পরে সুকৃতি দিয়ে (নিজের কাজ) পরিবর্তিত করে নেয় তাহলে আমি আল্লাহ ক্ষমাশীল ও করুণাময়।
💂পরিরাজ: আরবী ব্যাকরণের সূত্র অনুসারে এ বাক্যাংশের দু’রকম অর্থ হতে পারে। প্রথম অর্থ হলো, ভয়ের কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ যদি থাকে তাহলে তা হচ্ছে এই যে, রসূল কোন ভুল করেছেন। আর দ্বিতীয় অর্থ হলো, যতক্ষণ কেউ ভুল না করে ততক্ষণ আমার কাছে তার কোন ভয় নেই। অর্থাৎ অপরাধকারীও যদি তওবা করে নিজের নীতি সংশোধন করে নেয় এবং খারাপ কাজের জায়গায় ভাল কাজ করতে থাকে, তাহলে আমার কাছে তার জন্য উপেক্ষা ও ক্ষমা করার দরজা খোলাই আছে। প্রসঙ্গক্রমে একথা বলার উদ্দেশ্য ছিল একদিকে সতর্ক করা এবং অন্যদিকে সুসংবাদ দেয়াও। হযরত মূসা আলাইহিমুস সালাম অজ্ঞতাবশত একজন কিবতীকে হত্যা করে মিসর থেকে বের হয়েছিলেন। এটি ছিল একটি ত্রুটি। এদিকে সূক্ষ্ম ইঙ্গিত করা হয়। এ ত্রুটিটি যখন অনিচ্ছাকৃতভাবে তাঁর দ্বারা সংঘটিত হয়েছিল তখন তিনি পরক্ষণেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন এই বলেঃ “হে আমার রব! আমি নিজের প্রতি জুলুম করেছি। আমাকে মাফ করে দাও।”
💂পরিরাজ: আল্লাহ সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে মাফ করে দিয়েছিলেনঃ [৪০] আল্লাহ তাঁকে মাফ করে দিলেন। এখানে সেই ক্ষমার সুসংবাদ তাঁকে দেয়া হয়। অর্থাৎ এ ভাষণের মর্ম যেন এই দাঁড়ালোঃ হে মূসা! আমার সামনে তোমার ভয় পাওয়ার একটি কারণ তো অবশ্যই ছিল। কারণ তুমি একটি ভুল করেছিলে। কিন্তু তুমি যখন সেই দুষ্কৃতিকে সুকৃতিতে পরিবর্তিত করেছো তখন আমার কাছে তোমার জন্য মাগফিরাত ও রহমত ছাড়া আর কিছুই নেই। এখন আমি তোমাকে কোন শাস্তি দেবার জন্য ডেকে পাঠাইনি বরং বড় বড় মু’জিযা সহকারে তোমাকে এখন আমি একটি মহান দায়িত্ব সম্পাদনে পাঠাবো।
💂পরিরাজ: [৪১] আর তোমার হাতটি একটু তোমার বক্ষস্থলের মধ্যে ঢুকাও তো, তা উজ্জ্বল হয়ে বের হয়ে আসবে কোন প্রকার ক্ষতি ছাড়াই। এ (দু’টি নিদর্শন) ন’টি নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত ফেরাউন ও তার জাতির কাছে (নিয়ে যাবার জন্য) তারা বড়ই বদকার।”
পরিরাজ: সূরা বনী ইসরাঈলে বলা হয়েছে মূসাকে আমি সুস্পষ্টভাবে দৃষ্টিগোচর হয় এমন ধরনের নয়টি নিদর্শন দিয়ে পাঠিয়েছিলাম। সূরা আ’রাফে সেগুলোর বিস্তারিত বিবরণ বর্ণনা করা হয়েছেঃ
👩জেমি: সে নিদর্শন গুলো কি ছিল ?
💂পরিরাজ : সেগুলো হচ্ছে , (১) লাঠি, যা অজগর হয়ে যেতো (২) হাত, যা বগলে রেখে বের করে আনলে সূর্যের মতো ঝিকমিক করতো। (৩) যাদুকরদের প্রকাশ্য জনসমক্ষে পরাজিত করা (৪) হযরত মূসার পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী সারা দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়া। (৫) বন্যা ও ঝড় (৬) পংগপাল (৭) সমস্ত শস্য গুদামে শস্যকীট এবং মানুষ-পশু নির্বিশেষে সবার গায়ে উকুন। (৮) ব্যাঙয়ের আধিক্য (৯) রক্ত।
💂পরিরাজ: একইভাবে পবিত্র কুরআনের অন্য জায়গায় বলা হয়েছে'[৪২] সেখানে পৌঁছার পর উপত্যকার ডান কিনারায় পবিত্র ভূখণ্ডে একটি বৃক্ষ থেকে আহ্বান এলো, “হে মূসা! আমিই আল্লাহ, সমগ্র বিশ্বের অধিপতি।” আর (হুকুম দেয়া হলো) ছুঁড়ে দাও তোমার লাঠিটি। যখনই মূসা দেখলো লাঠিটি সাপের মতো মোচড় খাচ্ছে তখনই সে পেছন ফিরে ছুটতে লাগলো এবং একবার ফিরেও তাকালো না। বলা হলো, “হে মূসা! ফিরে এসো এবং ভয় করো না, তুমি সম্পূর্ণ নিরাপদ।
তোমার হাত বগলে রাখো উজ্জল হয়ে বের হয়ে আসবে কোন প্রকার কষ্ট ছাড়াই। এবং ভীতিমুক্ত হবার জন্য নিজের হাত দু’টি চেপে ধরো। এ দু’টি উজ্জল নিদর্শন তোমার রবের পক্ষ থেকে ফেরাউন ও তার সভাসদদের সামনে পেশ করার জন্য, তারা বড়ই নাফরমান।” মূসা নিবেদন করলো, “হে আমার প্রভু! আমি যে তাদের একজন লোককে হত্যা করে ফেলেছি, ভয় হচ্ছে, তারা আমাকে মেরে ফেলবে। আর আমার ভাই হারূন আমার চেয়ে বেশী বাকপটু, তাকে সাহায্যকারী হিসেবে আমার সাথে পাঠাও, যাতে সে আমাকে সমর্থন দেয়, আমার ভয় হচ্ছে, তারা আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করবে।”
আল্লাহ বললেন, তোমার ভাইয়ের সাহায্যে আমি তোমার শক্তি বৃদ্ধি করবো এবং তোমাদের দু’জনকে এমনই প্রতিপত্তি দান করবো যে, তারা তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আমার নিদর্শনগুলোর জোরে তোমরা ও তোমাদের অনুসারীরাই বিজয় লাভ করবে।”
💂পরিরাজ: একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, এটা হচ্ছে সেই তুর পাহাড় যার কথা কুরআনে কয়েক জায়গায় এসেছে। এখানে বলা হয়েছে [৪৩] এ কিতাবে মূসার বৃত্তান্তও বিবৃত কর। নিশ্চয়ই সে ছিল আল্লাহর মনোনীত বান্দা এবং (তাঁর) রাসূল ও নবী। আমি তাকে তুর পাহাড়ের ডান দিক থেকে ডাক দিলাম এবং তাকে আমার অন্তরঙ্গরূপে নৈকট্য দান করলাম। আর আমি তার ভাই হারুনকে নবী বানিয়ে নিজ রহমতে তাকে (একজন সাহায্যকারী) দান করলাম।
💂পরিরাজ: সূরা আ‘রাফে তা উল্লেখ করেছেন-[৪৪] আমি মূসার জন্য ত্রিশ রাতের মেয়াদ স্থির করেছিলাম (যে, এ রাতসমূহে তুর পাহাড়ে এসে ইতিকাফ করবে)। তারপর আরও দশ রাত বৃদ্ধি করে তা পূর্ণ করি। এভাবে তার প্রতিপালকের নির্ধারিত মেয়াদ চল্লিশ দিন হয়ে গেল এবং মূসা তার ভাই হারুনকে বলল, আমার অনুপস্থিতিতে তুমি সম্প্রদায়ের মধ্যে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে, সবকিছু ঠিকঠাক রাখবে এবং অশান্তি সৃষ্টিকারীদের অনুসরণ করবে না। মূসা যখন আমার নির্ধারিত সময়ে এসে পৌঁছল এবং তার প্রতিপালক তাঁর সাথে কথা বললেন, তখন সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দর্শন দিন আমি আপনাকে দেখব। তিনি বললেন, তুমি আমাকে কিছুতেই দেখতে পাবে না। তুমি বরং পাহাড়ের প্রতি দৃষ্টিপাত কর। তা যদি আপন স্থানে স্থির থাকে, তবে তুমি আমাকে দেখতে পারবে। অতপর যখন তার প্রতিপালক পাহাড়ে তাজাল্লী ফেললেন ( জ্যোতি প্রকাশ করলেন) তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচ‚র্ণ করে ফেলল এবং মূসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেল। পরে যখন তার সংজ্ঞা ফিরে আসল, তখন সে বলল,আপনার সত্তা পবিত্র।
আমি আপনার দরবারে তওবা করছি এবং (দুনিয়ায় কেউ আপনাকে দেখতে সক্ষম নয়- এ বিষয়ের প্রতি) আমি সবার আগে ঈমান আনছি।
💂পরিরাজ: এখন তোমাকে ফের ওহী সম্পর্কে রেখে যাওয়া কথাগুলো বলছি, উপরে আলোচনায় বর্ণিত ওহির নাযিলের তৃতীয় পদ্ধতিটি হচ্ছে, ফেরেশতা মানুষের আকৃতি ধারণপূর্বক নাবী কারীম (সাঃ)-কে সম্বোধন করতেন। তারপর তিনি যা কিছু বলতেন নবী কারীম (সাঃ) তা মুখস্থ করে নিতেন। এ অবস্থায় সাহাবীগণ (রাঃ)ও ফেরেশতাকে দেখতে পেতেন।
💂পরিরাজ: এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, [৪৫] ওদেরকে বলে দাও, যে ব্যক্তি জিব্রীলের সাথে শত্রুতা করে, তার জেনে রাখা উচিত, জিব্রীল আল্লাহরই হুকুমে এই কুরআন তোমার দিলে অবতীর্ণ করেছে; এটি পূর্বে আগত কিতাবগুলোর সত্যতা স্বীকার করে ও তাদের প্রতি সমর্থন যোগায় এবং ঈমানদারদের জন্য পথনির্দেশনা ও সাফল্যের বার্তাবাহী।
💂পরিরাজ: ইহুদিরা কেবল নবী (সাঃ) এবং তাঁর ওপর যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকেই গালাগালি দিতো না বরং তারা আল্লাহর প্রিয় মহান ফেরেশতা জিব্রীলকেও গালাগালি দিতো এবং বলতো; সে আমাদের শত্রু। সে রহমতের নয়, আযাবের ফেরেশতা।
অর্থাৎ এ জন্যই তোমাদের গালমন্দ জিব্রীলের ওপর নয়, আল্লাহর মহান সত্তার ওপর আরোপিত হয়।
এর অর্থ হচ্ছে, জিব্রীল এ কুরআন মজীদ বহন করে এনেছেন বলেই তোমরা এ গালাগালি করছো। অথচ কুরআন সরাসরি তাওরাতকে সমর্থন যোগাচ্ছে। কাজেই তোমাদের গালিগালাজ তাওরাতের বিরুদ্ধেও উচ্চারিত হয়েছে।
💂পরিরাজ: এখানে একটি বিশেষ বিষয়বস্তুর প্রতি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত করা হয়েছে। সেটি হচ্ছেঃ ওহে নির্বোধের দল! তোমাদের সমস্ত অসন্তুষ্টি হচ্ছে হিদায়াত ও সত্য-সহজ পথের বিরুদ্ধে। তোমরা লড়ছো সঠিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে। অথচ এই সঠিক ও নির্ভুল নেতৃত্বকে সহজভাবে মেনে নিলে তা তোমাদের জন্য সাফল্যের সুসংবাদ বহন করে আনতো।
💂পরিরাজ: ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় নাবী কারীম (সঃ)-এর নিকট ঘন্টার টুন টুন ধ্বনির মতো ধ্বনি শোনা যেত। ওহী নাযিলের এটাই ছিল সব চাইতে কঠিন অবস্থা। টুন টুন ধ্বনির সংকেত প্রকাশ করতে করতে ফিরিশতা ওহী নিয়ে আগমন করতেন এবং নাবী (সঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। ওহী নাযিলের সময় কঠিন শীতের দিনেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কপাল থেকে ঘাম ঝরতে থাকত। তিনি উষ্ট্রের উপর আরোহণরত অবস্থায় থাকলে উট বসে পড়ত। এক দফা এইভাবে ওহী নাযিল হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উরু যায়দ বিন সাবেত (রা:)-এর উরুর উপর ছিল। তখন তাঁর উরুতে এতই ভারবোধ হয়েছিল যে মনে হয়েছিল যেন উরু চূর্ণ হয়ে যাবে।
💂পরিরাজ: নাবী কারীম (সঃ) ফিরিশতাকে কোন কোন সময় নিজস্ব জন্মগত আকৃতিতে প্রত্যক্ষ করতেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় সেই অবস্থাতেই তিনি তাঁর নিকট ওহী নিয়ে আগমন করতেন। নাবী কারীম (সঃ)-এর এ রকম অবস্থা দু’বার সংঘটিত হয়েছিল যা আল্লাহ তা‘আলা সূরাহ ‘নাজমে’ উল্লেখ করেছেন।
💂পরিরাজ: পবিত্র মি’রাজ রজনীতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন আকাশের উপর অবস্থান করছিলেন সেই সময় আল্লাহ তা‘আলা নামায এবং অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে সরাসরি হুকুমের মাধ্যমে ওহীর ব্যবস্থা করেছিলেন।
💂পরিরাজ: আল্লাহ তা‘আলার সঙ্গে নাবী কারীম (সাঃ)-এর সরাসরি কথোপকথন যেমনটি হয়েছিল, তেমনি মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে হয়েছিল।
কোন কোন লোক পর্দা বা আবরণ ব্যতিরেকে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সাঃ)-এর সামনা-সামনি কথোপকথনের মাধ্যমে ওহী নাযিলের অষ্টম রীতির কথা বলেছেন। কিন্তু ইসলামের পূর্বসূরীদের হতে শুরু করে পরবর্তীদের সময়কাল পর্যন্ত এ পদ্ধতিতে ওহী নাযিলের ব্যাপারে মতভেদ চলে আসছে।
👩জেমি : ওহী কী ধারাবাহিকভাবে নাযিল হয়েছে নাকি মাঝেমধ্যে বিরতি নিয়ে তারপর আবার নাযিল হয়েছে।
💂পরিরাজ: বলছি;
💂পরিরাজ: মহানবী (সাঃ) বিশ্ব মানবতার মুক্তির জন্য বিশেষ করে আরব সমাজের বিরাজমান অন্যায় অশান্তি ও মানুষের প্রভুত্ব থেকে কীভাবে মুক্তি পেতে পারে এ চিন্তায় মগ্ন ছিলেন তিনটি বছর। পারিপার্শ্বিক হৈচৈ ও হট্রগোল থেকে নির্জনতায় ও কোলাহল মুক্ত পরিবেশে হেরা গুহায় আধ্যাত্মিক ও রুহানি সফরে সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে গভীর ভাবনার পর তার ওপর প্রথম ওহী আসে পবিত্র রমজানের কদরের রজনীতে সূরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত, দশ দিন বিরতির পর দ্বিতীয় ওহী আসে সূরা মুদ্দাসসিরের প্রথম প্রথম পাঁচ আয়াত।
💂পরিরাজ: ওহী স্থগিত হওয়া প্রসঙ্গে নবী (সাঃ) বলেন, [৪৬] একদা আমি হেঁটে চলছি, হঠাৎ আকাশ থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পেয়ে চোখ তুলে তাকালাম! দেখলাম, সেই ফিরিশতা, যিনি হেরায় আমার কাছে এসেছিলেন, আসমান ও যমীনের মাঝখানে একটি কুরসীতে বসে আছেন, এতে আমি ভয় পেয়ে গেলাম, তৎক্ষণাৎ আমি ফিরে এসে বললাম আমাকে বস্ত্রাবৃত কর! আমাকে বস্ত্রাবৃত কর! তারপর আল্লাহতায়ালা নাযিল করলেন,
👉কোরআন : হে বস্ত্র মুড়ি দিয়ে শয়নকারী!
💂পরিরাজ: এখানে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ইয়া আয়্যুহাল রাসূল বা (ইয়া আয়্যুহান্নাবীয়ু) বলে সম্বোধন করার পরিবর্তে (ইয়া আয়্যুহাল মুদ্দাস্সির) বলে সম্বোধন কেন করা হয়েছে। নবী (সাঃ) যেহেতু হঠাৎ জিবরাঈলকে আসমান ও পৃথিবীর মাঝখানে একটি আসনে উপবিষ্ট দেখে ভীত হয়ে পড়েছিলেন এবং সে অবস্থায় বাড়ীতে পৌঁছে বাড়ীর লোকদের বলেছিলেনঃ আমাকে চাদর দিয়ে আচ্ছাদিত করো, আমাকে চাদর দিয়ে আচ্ছাদিত করো। তাই আল্লাহ তাঁকে (ইয়া আয়্যুহাল মুদ্দাস্সির) বলে সম্বোধন করেছেন।
💂পরিরাজ: সম্বোধনের এ সূক্ষ্ম ভংগী থেকে আপনা আপনি এ অর্থ পরিস্ফূটিত হয়ে ওঠে যে, হে আমার প্রিয় বান্দা, তুমি চাদর জড়িয়ে শুয়ে আছো কেন? তোমার ওপরে তো একটি মহৎ কাজের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। এ দায়িত্ব পালন করার জন্য তোমাকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উঠে দাঁড়াতে হবে।
👉কোরআন : ওঠো এবং সাবধান করে দাও,
💂পরিরাজ: হযরত নূহ আলাইহিস সালামকে নবুওয়াতের পদমর্যাদায় অভিষিক্ত করার সময় যে আদেশ দেয়া হয়েছিল এটাও সে ধরনের আদেশ। হযরত নূহ আলাইহিস সালামকে বলা হয়েছিলঃ [৪৭] “তোমার নিজের কওমের লোকদের ওপর এক ভীষণ কষ্টদায়ক আযাব আসার পূর্বেই তাদের সাবধান করে দাও।”
💂পরিরাজ: আয়াতটির অর্থ হলো, হে বস্ত্র আচ্ছাদিত হয়ে শয়নকারী, তুমি ওঠো। তোমার চারপাশে আল্লাহর যেসব বান্দারা অবচেতন পড়ে আছে তাদের জাগিয়ে তোল। যদি এ অবস্থায়ই তারা থাকে তাহলে যে অবশ্যম্ভাবী পরিণতির সম্মুখীন তারা হতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে তাদের সাবধান করে দাও। তাদের জানিয়ে দাও, তারা “মগের মুল্লুকে” বাস করছে না যে, যা ইচ্ছা তাই করে যাবে, অথচ কোন কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হবে না।
👉কোরআন : তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো,
💂পরিরাজ: আর এ কারণেই ইসলামে “আল্লাহু আকবার” (আল্লাহই শ্রেষ্ঠ) কথাটিকে সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। “আল্লাহু আকবার” ঘোষণার মাধ্যমেই আযান শুরু হয়। আল্লাহু আকবার একথাটি বলে মানুষ নামায শুরু করে এবং বার বার আল্লাহু আকবার বলে ওঠে ও বসে। কোন পশুকে জবাই করার সময়ও “বিসমিল্লাহে আল্লাহু আকবার” বলে জবাই করে। তাকবীর ধ্বনি বর্তমান বিশ্বে মুসলমানদের সর্বাধিক স্পষ্ট ও পার্থক্যসূচক প্রতীক। কারণ, ইসলামের মহানবী (সাঃ) আল্লাহর বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণার মাধ্যমেই কাজ শুরু করেছিলেন।
💂পরিরাজ: এখানে আরো একটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে যা ভালভাবে বুঝে নেয়া দরকার। এ সময়ই প্রথমবারের মত রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে নবুওয়াতের বিরাট গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য তৎপর হতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এ আয়াতগুলোর “শানে নুযুল” থেকেই সে বিষয়টি জানা গিয়েছে। একথা তো স্পষ্ট যে, যে শহর, সমাজ ও পরিবেশে তাঁকে এ উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে কাজ করার জন্য তৎপর হওয়ার নির্দেশ দেয়া হচ্ছিল তা ছিল শিরকের কেন্দ্রভূমি বা লীলাক্ষেত্র। সাধারণ আরবদের মত সেখানকার অধিবাসীরা যে কেবল মুশরিক ছিল, তা নয়। বরং মক্কা সে সময় গোটা আরবের মুশরিকদের সবচেয়ে বড় তীর্থক্ষেত্রের মর্যাদা লাভ করেছিল।
আর কুরাইশরা ছিল তার ঘনিষ্ঠতম প্রতিবেশী, সেবায়ত ও পুরোহিত। এমন একটি জায়গায় কোন ব্যক্তির পক্ষে শিরকের বিরুদ্ধে এককভাবে তাওহীদের পতাকা উত্তোলন করা জীবনের ঝুঁকি গ্রহণ করার শামিল। তাই “ওঠো এবং সাবধান করে দাও” বলার পরপরই “তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো” বলার অর্থই হলো যেসব বড় বড় সন্ত্রাসী শক্তি তোমার এ কাজের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে হয় তাদের মোটেই পরোয়া করো না। বরং স্পষ্ট ভাষায় বলে দাও, যারা আমার এ আহবান ও আন্দোলনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে আমার “রব” তাদের সবার চেয়ে অনেক বড়। আল্লাহর দ্বীনের কাজ করতে উদ্যত কোন ব্যক্তির হিম্মত বৃদ্ধি ও সাহস যোগানোর জন্য এর চাইতে বড় পন্থা বা উপায় আর কি হতে পারে? আল্লাহর বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের নকশা যে ব্যক্তির হৃদয়-মনে খোদিত সে আল্লাহর জন্য একাই গোটা দুনিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে সামান্যতম দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও অনুভব করবে না।
👉কোরআন : তোমার পোশাক পবিত্র রাখো,
💂পরিরাজ: এটি একটি ব্যাপক অর্থ ব্যঞ্জক কথা। এর অর্থ অত্যন্ত বিস্তৃত। এর একটি অর্থ হলো, তুমি তোমার পোশাক-পরিচ্ছদ নাপাক বস্তু থেকে পবিত্র রাখো। কারণ শরীর ও পোশাক-পরিচ্ছদের পবিত্রতা এবং “রূহ” বা আত্মার পবিত্রতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কোন পবিত্র আত্মা ময়লা-নোংরা ও পূতিগন্ধময় দেহ এবং অপবিত্র পোশাকের মধ্যে মোটেই অবস্থান করতে পারে না। রসূলুল্লাহ (সাঃ) যে সমাজে ইসলামের দাওয়াতের কাজ শুরু করেছিলেন তা শুধু আকীদা-বিশ্বাস ও নৈতিক আবিলতার মধ্যেই নিমজ্জিত ছিল না
বরং পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার প্রাথমিক ধারণা সম্পর্কে পর্যন্ত সে সমাজের লোক অজ্ঞ ছিল। এসব লোককে সব রকমের পবিত্রতা শিক্ষা দেয়া ছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাজ। তাই তাঁকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, তিনি যেন তাঁর বাহ্যিক জীবনেও পবিত্রতার সর্বোচ্চ মান বজায় রাখেন।
এ নির্দেশের ফল স্বরূপ নবী (সাঃ) মানবজাতিকে শরীর ও পোশাক-পরিচ্ছদের পবিত্রতা সম্পর্কে এমন বিস্তারিত শিক্ষা দিয়েছেন যে, জাহেলী যুগের আরবরা তো দূরের কথা আধুনিক যুগের চরম সভ্য জাতিসমূহও সে সৌভাগ্যের অধিকারী নয়। এমনকি দুনিয়ার অধিকাংশ ভাষাতে এমন কোন শব্দ পর্যন্ত পাওয়া যায় না যা “তাহারাত” বা পবিত্রতার সমার্থক হতে পারে। পক্ষান্তরে ইসলামের অবস্থা হলো, হাদীস এবং ফিকাহর গ্রন্থসমূহে ইসলামী হুকুম-আহকাম তথা বিধি-বিধান সম্পর্কে সব আলোচনা শুরু হয়েছে “কিতাবুল তাহারাত” বা পবিত্রতা নামে অধ্যায় দিয়ে। এতে পবিত্রতা ও অপবিত্রতার পার্থক্য এবং পবিত্রতা অর্জনের উপায় ও পন্থাসমূহ একান্ত খুঁটিনাটি বিষয়সহ সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে।
💂পরিরাজ: একথাটির দ্বিতীয় অর্থ হলো, নিজের পোশাক-পরিচ্ছদ পরিষ্কার-পরিছন্ন রাখো। বৈরাগ্যবাদী ধ্যান-ধারণা পৃথিবীতে ধর্মাচরণের যে মানদণ্ড বানিয়ে রেখেছিল তাহলো, যে মানুষে যাতো বেশী নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন হবে সে ততো বেশী পূত-পবিত্র। কেউ কিছুটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাপড় পরলেই মনে করা হতো, সে একজন দুনিয়াদার মানুষ। অথচ মানুষের প্রবৃত্তি নোংরা ও ময়লা জিনিসকে অপছন্দ করে। তাই ঘোষণা করা হয়েছে যে, আল্লাহর পথে আহ্বানকারীর বাহ্যিক অবস্থাও এতোটা পবিত্র ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়া প্রয়োজন যেন মানুষ তাকে সম্মান ও মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখে এবং তার ব্যক্তিত্বে এমন কোন দোষ-ত্রুটি যেন না থাকে যার কারণে রুচি ও প্রবৃত্তিতে তার প্রতি ঘৃণার সৃষ্টি হয়।
💂পরিরাজ: একথাটির তৃতীয় অর্থ হলো, নিজের পোশাক পরিচ্ছদ নৈতিক দোষ-ত্রুটি থেকে পবিত্র রাখো। তোমার পোশাক-পরিচ্ছদ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন তো অবশ্যই থাকবে তবে তাতেও কোন প্রকার গর্ব-অহংকার, প্রদর্শনী বা লোক দেখানোর মনোবৃত্তি, ঠাটবাট এবং জৌলুসের নামগন্ধ পর্যন্ত থাকা উচিত নয়।
💂পরিরাজ: পোশাক এমন একটি প্রাথমিক জিনিস যা অন্যদের কাছে একজন মানুষের পরিচয় তুলে ধরে। কোন ব্যক্তি যে ধরনের পোশাক পরিধান করে তা দেখে প্রথম দৃষ্টিতেই মানুষ বুঝতে পারে যে, সে কেমন স্বভাব চরিত্রের লোক। নওয়াব, বাদশাহ ও নেতৃ পর্যায়ের লোকদের পোশাক, ধর্মীয় পেশার লোকদের পোশাক, দাম্ভিক ও আত্মম্ভরী লোকদের পোশাক, বাজে ও নীচ স্বভাব লোকদের পোশাক এবং গুণ্ডা-পাণ্ডা ও বখাটে লোকদের পোশাকের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে থাকে। এসব পোশাকই পোশাক পরিধানকারীর মেজাজ ও মানসিকতার প্রতিনিধিত্ব করে। আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর মেজাজ ও মানসিকতা স্বাভাবিকভাবেই এসব লোকদের থেকে আলাদা হয়ে থাকে। তাই তার পোশাক-পরিচ্ছদ তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে স্বতন্ত্র ধরনের হওয়া উচিত। তাঁর উচিত এমন পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান করা যা দেখে প্রত্যেকেই অনুভব করবে যে, তিনি একজন শরীফ ও ভদ্র মানুষ, যাঁর মন-মানস কোন প্রকার দোষে দুষ্ট নয়।
💂পরিরাজ: এর চতুর্থ অর্থ হলো, নিজেকে পবিত্র রাখো। অন্য কথায় এর অর্থ হলো, নৈতিক দোষ-ত্রুটি থেকে পবিত্র থাকা এবং উত্তম নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হওয়া। ইবনে আব্বাস, ইবরাহীম নাখয়ী, শা’বী, আতা, মুজাহিদ, কাতাদা, সা’ঈদ ইবনে জুবায়ের, হাসান বাসরী এবং আরো অনেক বড় বড় মুফাসসিরের মতে এটিই এ আয়াতের অর্থ। অর্থাৎ নিজের নৈতিক চরিত্রকে পবিত্র রাখো এবং সব রকমের দোষ-ত্রুটি থেকে দূরে থাকো।
প্রচলিত আরবী প্রবাদ অনুসারে যদি বলা হয় যে, অমুক ব্যক্তির কাপড় বা পোশাক পবিত্র অথবা অমুক ব্যক্তি পবিত্র।” তাহলে এর দ্বারা বুঝানো হয় যে, সে ব্যক্তির নৈতিক চরিত্র খুবই ভাল। পক্ষান্তরে যদি বলা হয় অমুক ব্যক্তির পোশাক নোংরা তাহলে এ দ্বারা বুঝানো হয় যে, লোকটি লেনদেন ও আচার-আচরণের দিক দিয়ে ভাল নয়। তার কথা ও প্রতিশ্রুতির উপর আস্থা রাখা যায় না।
👉কোরআন : অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকো,
💂পরিরাজ: অপবিত্রতার অর্থ সব ধরনের অপবিত্রতা। তা আকীদা-বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণার অপবিত্রতা হতে পারে, নৈতিক চরিত্র ও কাজ-কর্মের অপবিত্রতা হতে পারে।
আবার শরীর ও পোশাক-পরিচ্ছদ এবং উঠা বসা চলাফেরার অপবিত্রতাও হতে পারে।
💂পরিরাজ: অর্থাৎ তোমার চারদিকে গোটা সমাজে হরেক রকমের যে অপবিত্রতা ও নোংরামী ছড়িয়ে আছে তার সবগুলো থেকে নিজেকে মুক্ত রাখো।
💂পরিরাজ: কেউ যেন তোমাকে একথা বলার সামান্য সুযোগও না পায় যে, তুমি মানুষকে যেসব মন্দ কাজ থেকে নিবৃত্ত করছো তোমার নিজের জীবনেই সে মন্দের প্রতিফলন আছে।
💂পরিরাজ: ওহী সম্পর্কে ইসলামী পণ্ডিত সফি উসমানী মা'আরেফুল কোরআনের ভূমিকায় বলেছেন," আল্লাহ থেকে মানবজাতি তিনটি মাধ্যমে ইলম লাভ করে, ইন্দ্রিয়, বিবেক এবং ওহীর মাধ্যমে। যার শেষটি শুধুমাত্র নবী রাসূল পেয়ে থাকে। হেদায়াত দানের উদ্দেশ্যে আল্লাহ যুগে যুগে নবী -রাসূল প্রেরণ করেছেন। যার প্রথম হযরত আদম (আঃ) আর সর্বশেষ হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)। আর ওহীর মাধ্যমে আল্লাহ বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে তার বাণী নবী রাসূলদের কাছে অবতীর্ণ করেন। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী মুহাম্মদ (সাঃ) শেষ রাসূল বিধায় পৃথিবীতে আর কোন ওহী আসবে না। "
💂পরিরাজ: সূরা আলাকের কয়খানি আয়াত দিয়ে কুরআন নাজিল শুরু হয় এবং বিদায় হজ্জের খুতবা শেষে আরাফাত ময়দানে ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে ৯ জিলহজ একটি আয়াতের অংশবিশেষ হিসেবে সর্বশেষ যে ওহী নাজিল হয় তা হচ্ছে : [৪৮] আল ইয়াওমা আক্মালতু লাকুম দীনাকুম ওয়া আত্মামতু ‘আলায়কুম নিমাতী ওয়া রাদীতু লাকুমুল ইসলামা দীনা। আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের দীন ইসলামকে সানন্দ অনুমোদন দান করলাম।
💂পরিরাজ: মূলত শরিয়ত, তরিকত, হকিকত ও মারেফাতের দুর্বার গতিধারার অগ্রসফরের নবদিগন্ত উন্মোচিত হয় সেদিন হেরা গুহায় কুরআন নাজিলের মধ্য দিয়ে। এই কুরআন হচ্ছে মানুষের দিশারী, সৎ পথের স্পষ্ট নিদর্শন এবং সত্য - মিথ্যার পার্থক্যকারী।
👩জেমি: মূসা (আঃ) যে বলল, সে একজনকে হত্যা করেছে, সে কাকে হত্যা করেছে? কেন হত্যা করেছে? সে বিস্ময়কর কাহিনি কী?
💂পরিরাজ: সে অনেক ঘটনা,
👩জেমি: আমি সে রহস্যময় ঘটনা শুনতে চাই...
💕নবীন প্রেমের উদয়!
👉দ্বিতীয় খণ্ড
👉 পর্ব: বারো
, সমাপ্ত।।
👉রচনাকাল: সংশোধিত, ১ নভেম্বর ২০২২ মঙ্গলবার।।
👉বিশেষ দ্রষ্টব্য: কপিরাইট সংরক্ষিত৷
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন