নবীন প্রেমের উদয়! প্রথম খণ্ড
নাঈম হোসেন
পর্ব: তিন [হুবহু জেমির বর্নণা ];
জেমি: রাত প্রায় ইতির পথে, চারদিকে ভোরের পাখিদের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। কবিতার আসরটা বেশ ভালোই জমজমাট হয়েছিল। তিথি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমার দিকে দীর্ঘ নয়নে তাকিয়ে মাথাটা নিচু করে আমাকে প্রশ্ন করছে?
তিথি: জেমি?
জেমি: জি! হ্যাঁ!
তিথি: কখনও কারো প্রেমে পড়েছিস?
জেমি: না।
তিথি: কাউকে প্রেম করতে দেখেছিস?
জেমি: হ্যাঁ!
তিথি: কারো প্রেমের বিচ্ছেদ দেখেছিস?
জেমি: হ্যাঁ!
তিথি: কারো প্রেমের সমাধি দেখেছিস?
জেমি: বহু দেখছি।
তিথি: কোন প্রেম পাগলকে দেখেছিস?
জেমি: অনেক দেখছি।
তিথি: কারো প্রেম বিচ্ছেদের যন্ত্রণা অনুভব করেছিস?
জেমি: না।
জেমি: কথাগুলো শেষ না হতেই তিথির চোখ বেয়ে বেয়ে টপটপ করে অশ্রু ঝরছে..., ওর দেখাদেখি আমার চোখেও জল ডবডব করছে, আবারও একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে...
তিথি: জেমি!
জেমি: হ্যাঁ বল;
তিথি: আমাদের পাশের গ্রামের সূর্য ভাইয়াকে চিনিস?
জেমি: মাথাটা নেড়ে সায় দিলাম হ্যাঁ।
তিথি: কলেজ লাইফ থেকে আমরা দুজনে ক্লাসমেট। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে দু'জনে একত্রে ভর্তি হয়েছিলাম। ভার্সিটিতে অনেক সময় নানান ধরনের সমস্যায় পড়তাম। অনেক বড় বড় বিপদে সূর্য ভাইয়া আমার Helpmate (সহযোগী) হয়েছিল। পর্যায়ক্রমে আমি হঠাৎ তার প্রেমে বেপরোয়া হয়ে উঠলাম। এমনকি একটা সময় আমি তাকে শীঘ্র চির আপন করে কাছে পাবার জন্য বহু নিঝুম রাতে আকূল মনে জগদীশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে করতে শয়নকক্ষেই ঢের আছাড়ি-পিছাড়ি করছিলাম। তাই সম্ভবত ঈশ্বর আমার প্রার্থনা কবুল করছিলেন। শেষমেশ আমি সূর্যের প্রণয় ডোরে বন্দি হয়ে যাই। সেই থেকে সে এখন আমার একজন পাক্কা প্রেমিক। সে অনেক ঘটনা। শেষ যেদিন তার প্রেমে বশ হইবার জন্য অধীর হয়ে উঠলাম, সেদিনের ঘটনাটিই বলছি...
তিথি: ঈদের ছুটিতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেল।গোধূলিবেলায় গ্রামের বাড়িতে আসার জন্য তাড়াহুড়ো করে আমরা দু'জনেই যাত্রাবাড়ী বাস কাউন্টারে আসলাম। ডবল টিকিটের দামে একই বাসে দুটো টিকিট কিনবার জন্য প্রায় ঘন্টা খানেক স্টেশনে টিকিট খোঁজাখুঁজি করলাম। তবুও একই বাসে পাশাপাশি দুটো সিটের টিকিট পেলাম না। শেষমেষ বাধ্য হয়ে অনিচ্ছাকৃত দু'জনেই সদরঘাট থেকে একটা দোতলা লঞ্চে উঠলাম। লঞ্চেও লোকে টইটম্বুর। কোথাও পা রাখার মতো জায়গা ছিলনা। তারপরও লঞ্চে যাত্রী উঠানো হচ্ছে...
তিথি: তাদেরকে কিছু বলার মত সাহস কেউ পায়নি। প্রতিটি পদে পদে লঞ্চের স্টাফরা নৌ আইন ভঙ্গ করছে। তাদেরকে কিছু বলার বুকের পাটা কারো নেই। কারণ, অন্যায়কে বাঁধা দিতে অনেকেরই বুক কাঁপে। সত্য কথা বলতে কিছু লোকের বুক টিপটিপ করবেই। তাছাড়া বুকে বাঁশ ডলার ভয়ে সবখানে বুক ঠোকে কথা বলতেও নেই। প্রশাসনের লোকজনও চোখ বুজে নীরবতা পালন করছে। এর পেছনে নাকি অনেকগুলো কারণ আছে। সবকিছুই নাকি উপরি পাওয়ার জন্য করছে। আর লঞ্চের মালিক পক্ষের স্টাফরাও দক্ষিণা দেওয়ার জোরে এমনভাবে ওভার লোড করে যাত্রী উঠাচ্ছে।
তিথি: কিন্তু আইনের শাসক বন্ধুরা যদি ন্যায় পরায়ণ হতো তবে কোথাও এমনটা হতো না! তাই দেশের প্রশাসনসহ প্রতিটি অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, কর্মচারিদের পায়ে হাত দিয়ে অনুরোধ করছি...
তিথি: "হে আইনের সকল বন্ধুগণ! হে আইনের সকল ভ্রাতাগণ! আপনারা যে দেশেরই নাগরিক হয়ে থাকেন না কেন? যে ধর্মেরই অনুসারী হয়ে থাকেন না কেন? আপনারা স্বদেশের প্রতি সদা ভালোবাসা রাখুন! স্ব-স্ব ধর্মকর্মের প্রতি সর্বদা ভালোবাসা ও অটল বিশ্বাস রাখুন। এক ইলাহাতে সর্বদা বিশ্বাস করুন। স্ব-স্ব দেশের সংবিধান পড়ে, জেনে, বুঝে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ করুন। দেশের সকল আইন সম্পর্কে জানুন এবং মানুন।
তিথি: আমি হলফ করে বলছি, "হে জগতের সকল আইনের বন্ধুরা! আপনারা সতত সত্যের পক্ষে কথা বললে, সর্বদা ন্যায়ের পক্ষে থাকলে; ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করলে, খুব শীঘ্র এই মহীটা একটা স্বর্গপুরীতে পরিণত হবে।"
তিথি: তাই দুনিয়ার আইনের বন্ধুদেরকে স্ব-স্ব আইন ও ধর্মকর্মের প্রতি জানতে ও মানতে বিনীতকণ্ঠে হাতজোড় করে ফের আমার জীবনের দুর্ভাগা গল্পে প্রবেশ করছি,
তিথি: লঞ্চের একপাশে একটা চাদর বিছিয়ে, কোনমতে আমরা দুজনে বসলাম। কেবিনের জন্য তিনগুণ ভাড়া দিতে চেয়েছি তবুও কোন কেবিন খালি না থাকায় পায়নি। চারপাশের লোকজন বসার জন্য এখনো অনেক ঝগড়াঝাটি করছে,
তিথি: অনেক বিরক্তবোধ করছি।
তিথি: লঞ্চ ছেড়ে দেওয়া হয়েছে;
তিথি: অনেক কষ্টের মধ্যেই কেউ কেউ শোয়ার জায়গা পেল। কেউ আবার বসার জায়গাটুকু পেল। কারও ললাটে আবার চাপাচাপির মধ্যেই দাঁড়ানোর জায়গাটুকু জুটলো।
তিথি: আমরা পঞ্চাশ টাকার বাদাম কিনে দুজনে খেতে খেতে বেশ একটা খোশগল্পের আড্ডা ফাঁদিয়া বসলাম;
তিথি: আস্তে আস্তে রাত ঘনিয়ে আসছে, চারদিকে অমাবাস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে আসছে। লঞ্চের আলো ছাড়া বাইরে কোন আলো নেই। ধীরে ধীরে রাত অনেক হয়েছে। এখনও বসার জন্য মারকুটে ছেলেরা ও মারমুখো যাত্রীদের অনেকেই মারপিট করছে, এমনই সময় লঞ্চটি সর্বনাশা মেঘনা পাড়ি দিচ্ছে, হঠাৎ করে প্রচন্ড ঘূর্ণিঝড় শুরু হলো, ভয়ে আমার সর্বাঙ্গো ঠকঠক করে কাঁপছে...
তিথি: আমি ষোলকলা লজ্জা মাথার উপরে রেখে সূর্যকে কষে চেপে ধরলাম। পাশের লোকজন হাড়েহাড়ে টের পেল, আমরা স্বামী- স্ত্রী।
তিথি: আসলে তেমন কোন সম্পর্ক আমাদের মধ্যে নেই। আবহাওয়ার পূর্বাভাসেও বারংবার Red Signal দিচ্ছিল। সবার মধ্যেই ভয়াবহ ত্রাসের সঞ্চার হলো। সকলেই যার যার মতো করে ঈশ্বরকে ডাকছি।
তিথি: মুসলমানদের মধ্যে কেউ কেউ সুললিত কণ্ঠে কোরআন তেলাওয়াত করছে। কেউ আবার ভয়ে কান্নাভেজা কণ্ঠে সুমধুর সুরে আযান জুড়ে দিচ্ছে।
তিথি: আমি সূর্যকে ভয়ে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরলাম। সূর্য আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল;
সূর্য : একটু শান্ত হও! সবর করো! উপরওয়ালা যা ভালো মনে করেন, তাই হবে। একটা কথা মনে রেখ; ঈশ্বর সবসময়ই সবার সঙ্গে আছেন। অতএব, হতাশ হওয়ার কিছু নেই। চিন্তা করো না। ঈশ্বর আমাদের মঙ্গল করবেন।
সূর্য : আর হ্যাঁ এই আমি তোমাকে ছুঁয়ে কথা দিচ্ছি, বাঁচতে হলে দুজন একসঙ্গে বাঁচব, আর মরলেও দুজন এক সঙ্গেই মরব, তোমাকে একা ফেলে কোথাও যাব না ।".
তিথি : কিন্তু সূর্য আমার কে? আর আমি বা ওর কে? সেটা তখন কারো চিন্তারেখায় ছিলনা। তখন একটাই মাত্র হতাশা, একটাই শুধু প্রত্যাশা, কী উপায় এ ভয়াবহ বিপদ থেকে উদ্ধার হওয়া যায়। মুসলমানদের বিরাট একটা দল লঞ্চের এক অংশ জুড়ে উচ্চস্বরে কোরআন তেলাওয়াত করছে। কেউ আবার দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছে। ঝগড়া-ঝাঁটি, মারপিট মুহুর্তেই সব ভুলে সবাই একনিষ্ঠ আল্লাহর বান্দায় পরিণত হলো।
তিথি: কে হিন্দু? কে খ্রিষ্টান? কে মুসলিম? তখন কোন ভেদাভেদ ছিলনা। সকলে একসঙ্গে, একসুরে, আল্লাহর নামের যিকির করছি। তখন সবাই আল্লাহর ঐশী সাহায্যের দিকে তাকিয়ে আছি!
তিথি: কখন আসবে আল্লাহর সাহায্য? কীভাবে আসবে আল্লাহর সাহায্য সেদিকে তাকিয়ে আল্লাহ্, আল্লাহ্ যিকির করছি!
তিথি: আচমকা একটা ধমকা হাওয়ার সাথে বিরাট একটা তুফানের ঢেউ এসে ধাক্কা দিলে, লঞ্চটা একদিকে কাত হয়ে যায়। ক্যাপ্টেন বারবার সতর্ক করে বলছিল, কেউ স্বস্থান থেকে Deviation ( নড়াচড়া ) করতে না।
তিথি : এমনকি তিনি পইপই করে নড়াচড়া না করার জন্য হাতজোড় করছিলেন। কিন্তু কে শুনে কার কথা? পুরো লঞ্চই লোকে পরিপূর্ণ। সবাই জীবন রক্ষায় হইহই, রইরই করতে ছিল।
তিথি: ডান পাশের লোকজন বাম পাশে আর বাম পাশের লোকজন ডান পাশে আইঢাই হয়ে ছুটাছুটি করছে,
তিথি: তড়িঘড়ি করে লঞ্চটি সমুদ্রে ডুবে যাচ্ছে, সকলেই তড়িৎ বেগে আত্মরক্ষায়, লাইফবোর্ড, বেলাভুমি নিয়ে যে যেভাবে পারছে মহাসমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।
তিথি : আমরাও ঈশ্বরের নাম জপতে জপতে একটা জীবনবেলা দুজনে আঁকড়ে ধরে মহা সমুদ্রের মাঝে ঝাঁপ দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে চারপাশ দিয়ে সাগরের ঢেউয়ের তালে তালে আমরাও চুবানি খাচ্ছি।
তিথি: বারিধির তরঙ্গের তালেতালে পরিধেয় বস্ত্র সব চোখের পলকের মধ্যে খসে গেছে। আমরা জল পান করতে করতে Half dead প্রায়! প্রাণবায়ুটা নিবুনিবু করছে। মালুম হচ্ছে, চতুর্দিক থেকে আমরা নিরানব্বুইয়ের চুবনি খাচ্ছি।
তিথি: আঁচ হচ্ছে, মিনিটের মধ্যেই যেন আমরা হিল্লোলের তালেতালে কয়েকশত মাইল দূরে চলে আসছি। আচকা একটা বড় ঢেউ এসে আমাদেরকে একটা তীরে পৌঁছে দিল, পায়ের তলায় মাটি ঠেকছি। অনেক ক্লান্ত মনে দুজনেই তৎক্ষণাৎ ঈশ্বরকে কৃতজ্ঞতা জানালাম।
তিথি: হাত-পা, সর্বাঙ্গো শীতে কনকন করে কাঁপছে।
পেট জলে টইটম্বুর। মুখের মধ্যে আঙ্গুল দিয়ে বারবার ভমি করছি,
তিথি: এক হাত দিয়ে বেলাটা ধরে রাখছি। সূর্য এক হাত দিয়ে আমাকে শক্ত করে ধরে রাখছে।
তিথি: চারদিকে এখনো অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। সামনে সমুদ্র আছে ভেবে পা বাড়ালাম না। হাত-পা ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে আসছে।
তিথি: হঠাৎ Senseless হয়ে সূর্যের গায়ে ঢলে পড়ছি। তারপর কি হতে কী হয়েছে কিছুই আচ করতে পারছি না। হুঁশ ফিরে আমাদেরকে একটা বড় হাসপাতালের মধ্যে চিকিৎসাধীন দেখছি।
তিথি: আমাদেরকে একদৃষ্টি দেখার জন্য পুরো হাসপাতালবর্তী হাজারো দর্শকের ভীড়। ফটো সাংবাদিকরা ঘুরে ঘুরে বারবার আমাদের ফটো তুলছে। একজন মুরব্বি টাইপের খুড়ো আমাদের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে বলছেন ; হে প্রভু! তোমার দরবারে কোটি কোটি শুকরিয়া আদায় করছি, শুকরিয়াতান আলহামদুলিল্লাহ্ ! তাঁর হাত -পায়ে ষষ্টির কম্পন, আমি কম্পিত কণ্ঠে বলছি; আমরা কী উপায়ে এখানে আসছি?
তিথি : খুড়ো পান চিবাইতে চিবাইতে মাথা নেড়ে নেড়ে বলল; " মুই মাঝের চরের বাসিন্দা গনি মিয়া। ভেইন্না সময় নদীতে রেনুর পোনা ধরতে যাইয়া, তোমাগোরে দেইখ্যা মোর পরাণে টাশকি লাইগ্যা গেছে। মুই এক্কেবারে জন্মেরমতো খ্যাততোর খাইয়া গেছি। ওমা! দেখি কী, নদীর চরে তোমরা বিবস্ত্র অবস্থায় একজন আরেকজনের উপরে মূর্ছা খাইয়া পইড়া রইছো। হেইয়্যারপর মুই বাড়িতে যাইয়া কাপড় - চোপড় আইন্না তোমাগোরে পরাইয়া দিছি। "
গনিমিয়া: হেইয়ারপর লোকজন বোলাইয়া আইন্না ধরাধরি কইরা তোমাগোরে এই হাসপাতালে ভর্তি করছি।
গনিমিয়া: ও মনু তোমরা ঐহানে কেমনে গেছো?
তিথি: আমরা পূর্বাপর ঘটনার বিস্তারিত খুলে বলছি। ইতিমধ্যে ডাক্তার এসে বলল; তোমরা এখন পুরোপুরি সুস্থ। আমরা সবাইকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে হাসপাতাল থেকে প্রস্থান করলাম।
তিথি : সে ঘটনার পর সেদিন থেকে আমাদের মধ্যে নবীন প্রেমের উদয় সৃষ্টি হলো।
তিথি: তারপর থেকে দুজন দুজনকে প্রাণপণে ভালবাসতে লাগলাম। আমি ওকে দেবতাতুল্য ভালবাসতে লাগলাম। এই পিরিতের বাঁধনটা চতুর্থ বছরে পা দিয়েছে। ঠিক এমনই সময় সহসা একদিন বড় ভাবির কাছ থেকে জানতে পারলাম, Papa নাকি ঘটক দিয়ে ভালো পাত্রের অনুসন্ধান করতেছেন?
তিথি: তারপর নিভৃত এক পরিবেশে বাবা - মা কে আমাদের মধ্যে প্রেমের ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললাম। ওনারা শুনে আমাদের প্রণয় Accept করছেন।
তিথি : আমি খুশিতে লাজুক লাজুক এক চিমটি হেসে দিলাম। So. সূর্যের সঙ্গেই আমার বিয়ে ঠিক করা হলো। শুভ তিথি দেখে বিয়ের দিনক্ষণ পাকাপোক্ত করা হলো। ঘরবাড়ি ষোলকলা পরিপাটির কাজ চলছে৷
তিথি : পরিবারের একমাত্র আদুরে হওয়াতে খুব ঘটা করেই বিয়ের আয়োজন চলছে। পুরো বাড়িটা ঝিকিমিকি তারকার মতো বিজলী বাতি দিয়ে সাজানো হচ্ছে। ফুলশয্যার কামরাটাও টুকটুকে লাল গোলাপ দিয়ে সাজানো হচ্ছে। পুরো বাসরশয্যা জুড়ে বিজলী চমকানো বাতি দিয়ে সাজানো হচ্ছে। পুরো বাড়িটিই ঝিলমিল ঝিলমিল করছে।
তিথি: বিয়ের আর মাত্র দু'দিন বাকি। এমনসময় শেষ বিকেলে আমি ফোনে সূর্যকে আমাদের কাছাকাছি বাজারে আসতে বললাম। দুজনে একত্রে বাসর শয্যার উপহার পছন্দ করে কেনাকাটা করার জন্য। কিন্তু আমি কী জানতাম, ইঁদুর কপাল আমাকে হাতছানি দিয়ে পইপই করে ডাকছে?
তিথি: দুজনের পছন্দ মতো Surprised কিনে আমাদের Personal গাড়িতে বাড়িতে আসতেছিলাম। সূর্য ড্রাইভ করছিল। আমি পাশে বসা ছিলাম।
তিথি: সূর্য ট্রাফিক নীতিমালা ষোলকলা মেনেই গাড়ি চালাচ্ছিল। মাঝপথে একটা বড়ো বাস এসে ওভারটেক করতে গিয়ে আমাদের গাড়িটাকে অবৈধভাবে পিছন থেকে আচম্বিত ধাক্কা দিলে আমাদের Car টা ছিটকে রোডের বাইরে পড়ে যায়। লোকজন কারেন্টের গতিতে দ্রুত দৌড়ে এসে প্রথমে আমাকে টেনে হেঁচড়ে বের করল৷
তিথি: আমার শুধুমাত্র ডানহাতে বিষম Stroke (চোট ) লেগেছিল। আমি সূর্য, সূর্য বলে সজোরে গলা চেঁচাচ্ছিলাম।
তিথি : আমার চিৎকারে উপস্থিত জনসাধারণ সূর্যকে ধরাধরি করে টেনে বের করল। সূর্যের মাথা ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছিল। সঙ্গে সঙ্গে Ambulance করে রক্তাক্ত শরীরে ওকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হল। সূর্যের অচৈতন্য অবস্থায়ই চিকিৎসা চলছে। ওর হুঁশ ফিরে আসা মাত্রই তিথি, তিথি বলে মুখ নড়ে উঠল; আমি ওর মাথার পাশেই বসা ছিলাম। হাউস সার্জন কথা না বলতে বারবার হাতজোড় করছিল। তবুও আমি বলছি এইতো আমি তোমার পাশেই আছি।
সূর্য : একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল; তিথি আমাকে একটু জল দাও!
তিথি: আমি ওর মুখের কাছে জল ধরতেই এক চুমুক জল পান করে বলল;
সূর্য : তিথি তোমার হাতটা আমার বুকে রাখ!
তিথি: আমি ওর বুকে হাত রাখতেই অমনি ও কচি বাচ্চার মতো গুমরে কেঁদে উঠল; ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল;
সূর্য : একটি নিরাপদ সড়কের জন্য আজকে তোমাকে ছেড়ে যেতে হচ্ছে, আর যেন কারো জীবন এভাবে অকালে ঝড়ে না যায় তার জন্য তুমি আজীবন একটি নিরাপদ সড়কের লড়াই করবে এটা তোমার প্রতি আমার অন্তিম আদেশ।
সূর্য : তিথি আমাকে আদর করে ঘুম পড়িয়ে দাও! আমার মুখে আবারও থোরা জল দাও! আমাকে এক্ষুনি পরলোকে যেতে হবে। ঐতো ঐ সৃষ্টিকর্তা আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছেন। তাড়াতাড়ি আমাকে চিরবিদায় দাও!
সূর্য : ঐ যে দেখ কারা যেন আমাকে পইপই করে ডাকছে। তাদের আমন্ত্রণে এ যাত্রাত আমাকে যেতেই হবে। ঐতো ঐ, অপরিচিত কারা যেন আমাকে উঠিয়ে নিতে আসছেন। ঐতো ঐ, আমি সানাইয়ের সুর স্বকর্ণে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি।
সূর্য : আর হ্যাঁ একটা কথা মনে রেখ, এজনমে আমার জন্য কোন আফসোস করবেনা। আমি সবসময় ছায়া হয়ে তোমার পাশেই থাকব। তোমার শাড়ির আঁচল সর্বদা আমার জন্য বিছিয়ে রেখো। পরজনমে ওপারে তোমার সাথে আমার সত্যি সত্যিই ফুলশয্যা হবে। আমি তোমার অপেক্ষায় থাকবো । তখন তুমি আমাকে চিনবে তো?
তিথি : সূর্য অনন্তনিদ্রায় ঢলে পড়লো।
তিথি : আমি সূর্য, সূর্য বলে আকাশ কাপানো চিৎকারে অচেতন হয়ে যাই।
তিথি: আমার সেই বাসরশয্যা এখনো প্রতিদিন চোখের জলে সিক্ত হচ্ছে।
তিথি: শুনছি বাবা ফের ভালো পাত্রের সন্ধান করছেন,
তিথি : জেমি?
জেমি: হ্যাঁ বল!
তিথি : শোন ; হয়ত বাবার এ হাতআর্জি শেষমেশ আমি রাখতে পারবনা।
তিথি: এই প্রথমবার হয়ত আমি বাবার অবাধ্য হবো।
জেমি: তিথি কচি খুকীর মতো আবারও ডুকরে কেঁদে উঠল!
নবীন প্রেমের উদয়! প্রথম খণ্ড, পর্ব : তিন ,
সমাপ্ত।।
[রচনাকালঃ ৩০ ফেব্রুয়ারি ২০১২ইং]
বিশেষ দ্রষ্টব্য : কপিরাইট সংরক্ষিত ৷
অসাধারণ লেখা , পড়ে বিমোহিত হলাম ৷ ধন্যবাদ লেখককে ৷
উত্তরমুছুনচমৎকার সৃজন
উত্তরমুছুন